মৌমাছি এবং মানুষ: আশ্চর্যজনক মিল

মৌমাছি এবং মানুষ: আশ্চর্যজনক মিল
Coin on wooden table in front of green bokeh background. coins a concept of investment and saving moneys.

মৌমাছি একটি পতঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও তাদের সামাজিক আচরণ, বুদ্ধিমত্তা ও কাজ কর্মের জন্য মানুষের সাথে রয়েছে আশ্চর্য কিছু মিল। আসুন খুঁজে বের করি সেগুলো কি কি হতে পারে। সামাজিক ব্যবহার মানুষ যেমন দলবদ্ধভাবে সামাজিক রীতিনীতি পালন করে বসবাস করে তেমনি মৌমাছিদেরও রয়েছে নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থা এবং সামাজিক রীতিনীতি। একটি মৌচাকে গড়ে তারা ৫০-৬০ হাজার শ্রমিক মৌমাছি বসবাস করে। বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতি মোকাবেলা করে তারা তাদের মৌচাক বা সমাজকে উন্নত করে। যেখানে পৃথকভাবে মৌমাছিদের বিভিন্ন ভূমিকা পালন করতে হয়। এদের মাঝে আছে শ্রমিক মৌমাছি প্রতি নিয়ত যারা ফুলের মধু আহরন করে মৌচাকে মধু জমা করে এবং মৌচাককে নিরাপত্তা দেয় (নারী মৌমাছি), পুরুষ মৌমাছি (বংশ বিস্তারের জন্য ও রানীকে দেখে রাখার জন্য) এবং একজন রানী মৌমাছি (যে মৌচাকের প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে)। এভাবে মানুষের মতোই মৌমাছিরাও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস সহ সমাজ গঠন করে বসবাস করে।

যোগাযোগ
মৌমাছি, মৌমাছি
কোথা যাও নাচি নাচি
দাঁড়াও না একবার ভাই।

ওই ফুল ফোটে বনে
যাই মধু আহরণে
দাঁড়াবার সময় তো নাই।

কবিতার লাইনের মতোই আসলেই এদের ভীষন ব্যস্ততা। তাদের এই নেচে নেচে উড়ে চলা কোনো সাধারণ উড়ে চলা নয়। এই উড়ে চলার ছন্দে একজনের সাথে অন্যজনের অমিল রয়েছে। কারন তারা সেই উড়ে চলার ছন্দের মাধ্যমে একে অপরের সাথে ভাষা বিনিময় করে। এভাবেই মৌমাছিরা খাদ্যের উৎসের অবস্থান জানাতে একটি নাচের ভাষা ব্যবহার করে। মানুষও চিন্তা, আবেগ এবং ধারণা প্রকাশের জন্য কথ্য ভাষা এবং অমৌখিক ইঙ্গিত ব্যবহার করে।

মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা
মৌমাছি এবং মানুষ পরিশ্রমী এবং কষ্টসহিষ্ণু স্বভাবের। বিভিন্ন পরিবেশে মৌমাছি নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। মৌমাছিরা বিভিন্ন জলবায়ুতে বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি প্রকৃতির পরিবেশগত অবস্থার জন্য তাদের আচরণকে সামঞ্জস্য করতে পারে। একইভাবে, মানুষ তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং সৃজনশীলতা ব্যবহার করে সমস্যা সমাধান করতে এবং চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার ইতিহাস রয়েছে।
ইকোসিস্টেমের গুরুত্ব
মৌমাছি এবং মানুষ উভয়ই তাদের নিজ নিজ বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মৌমাছি পরাগায়নের মাধ্যমে উদ্ভিদ প্রজাতির বিভিন্ন পরিসর বজায় রাখতে সাহায্য করে। মৌমাছি যদি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে প্রাণি জগতের বৈশ্বিক খাদ্য সংকট দেখা দিবে। মানুষ সহ অন্যান্য বিভিন্ন প্রাণির খাদ্য সংকট শুরু হওয়ায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে নানা পশুপাখি ও প্রাণিকুল। এজন্য সামগ্রিকভাবে পরিবেশকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে। একইভাবে, মানুষ তাদের ক্রিয়াকলাপ যেমন কৃষিকাজ, শিল্প এবং নগরায়নের মাধ্যমে পরিবেশের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সকল বিষয়কে ত্যাগ করা উচিত।

বুদ্ধিমত্তা
মৌমাছি এবং মানুষ উভয়ই বুদ্ধিমান প্রাণী। যারা শিখতে, সমস্যা সমাধান করতে এবং যোগাযোগ করতে সক্ষম। মৌমাছি জটিল পরিবেশে নেভিগেট করতে শিখতে পারে, প্রতিটি বস্তুকে, ফুলকে আলাদা করে চিনতে পারে এবং অন্যান্য মৌমাছিদের সাথে খাদ্য উত্সের অবস্থান নির্নয় করে দিতে পারে। তাদের ঘ্রাণ শক্তির আছে বিশেষ ক্ষমতা যা তাদের বিভিন্ন বস্তুকে আলাদাভাবে চিনতে সাহায্য করে। এছাড়াও তাদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা রঙের বৈচিত্রতা যা মানুষ সহজে না বুঝলেও তারা ঠিকই একেকজন থেকে আরেকজনকে আলাদা করে চিনতে পারে। তাদের নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার জন্য তারা সবসময় ব্যস্ত থাকে। জেনে আশ্চর্য হবেন যে মৌমাছিরা অতন্দ্র প্রহরী কারন এরা কখনো ঘুমায় না। একইভাবে, মানুষ তার শৈল্পিক সৃজনশীলতার মাধ্যমে প্রতিভার বিকাশ, যোগাযোগ এবং উন্নত প্রযুক্তি জিপিএসে মাধ্যমে বর্তমানে ভৌগলিক যেকোনো জায়গায় চলাচল করতে সক্ষম। এছাড়াও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা থাকার কারনে পরিস্থিতির বদল এবং নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা প্রদর্শন করে থাকে।

শৈল্পিকতা ও উন্নত বাসস্থান
মানুষ যেমন নিজের প্রয়োজনে বাসস্থান নির্মান করে নিজেদের নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য্যের কথা মাথায় রেখে। মৌমাছিরাও তাদের মৌচাক নির্মাণ করে আশ্চর্য্যজনকভাবে শৈল্পিক এবং উপযোগী উন্নত বাসস্থানে বসবাসের জন্য। প্রতিটি কোষ হয় ষড়ভূজ আকৃতির। এর কারনে সবচেয়ে কম জায়গায় মধু সংরক্ষণ সহজ হয় এবং মোমের প্রলেপ দিয়ে দেয়ায় একটি পরিণত মধু কোষ কক্ষ সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ ও সতেজ থাকে। পাশাপাশি ষড়ভূজ আকৃতির জন্য মৌচাক শক্তিশালী হয় এবং বিভিন্ন আকারে মৌচাককে গঠন করা সহজ হয়। ষরভূজ সেই কোষগুলোর জন্য যেকোনো আবহাওয়া তাদের অনুকূলে তৈরি হয়। ষড়ভুজগুলির একটি দক্ষ বায়ু সঞ্চালন ব্যবস্থা রয়েছে, যা গ্রীষ্মে মৌচাকে শীতল এবং শীতকালে উষ্ণ থাকতে সাহায্য করে।

মৌমাছি এবং মানব জাতির মধ্যে পারষ্পরিক শুধু মিল নয় বরং একে অন্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অপরিহার্য। পতঙ্গ পরাগায়নের মাধ্যমে যেমনি উদ্ভিদ জগতকে মৌমাছিরা সমুন্নত করে এবং প্রাণি জগতের খাদ্য সংকট থেকে রক্ষা করে। মানব জাতিরও উচিত খাদ্য বা ফসল উতপাদনের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার না করা। এতে করে মৌমাছির মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পতঙ্গ আমাদের মাঝে থেকে বিলীন হয়ে যেতে পারে এবং সেই স্থান বা এলাকার জন্য খাদ্য সংকট ও প্রাণি খাদ্যের অভাব দেখা দিতে পারে। তাই মৌমাছির সাথে শুধু সাদৃশ্যতা নয় বরং মানব জাতির সাথে মৌমাছির সখ্যতা থাকাও বাঞ্ছনীয়।

পূর্ববর্তী খরচকে সঞ্চয়ে রুপান্তর করুন !
পরবর্তী কক্সবাজারের কাকাতুয়া