কল্পনাপ্রসূত ধারণা থেকে ভ্যালেন্টাইন ডের প্রচলন

কল্পনাপ্রসূত ধারণা থেকে ভ্যালেন্টাইন ডের প্রচলন - মতামত - ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ (ফাইল ছবি)
কল্পনাপ্রসূত ধারণা থেকে ভ্যালেন্টাইন ডের প্রচলন - মতামত - ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ (ফাইল ছবি)

www.HelloBangla.News – মতামত – ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫: ১৪ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে পালিত হয় ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। বাংলাদেশে তিন যুগ আগে থেকে এর ব্যাপকতা লক্ষ করা যায়। বিশ্বের মানুষ এই দিনটিতে একে ওপরের কাছে ভালোবাসা প্রকাশ করে ফুল, কার্ড বা চকলেট পাঠিয়ে থকে। যদিও বিশ্ব ভালোবাসা দিবসটি প্রচলনের ঐতিহাসিক সত্যতা নেই। সমাজ বিজ্ঞানীরা ঐতিহাসিকরা বলেছেন কল্পনাপ্রসূত ধারণা থেকে ভ্যালেন্টাইন ডের প্রচলন। সেগুলো মূলত সম্পূর্ণ “মৌখিক এবং লিখিত সাহিত্য”।

তবে এটা সত্য যে একজন বিখ্যাত সেইন্ট বা ধর্ম যাজকের নাম থেকে দিনটি এমন নাম পেয়েছে। তবে তিনি কে ছিলেন – তা নিয়ে বিভিন্ন গল্প রয়েছে। প্রথম ভ্যালেন্টাইন’স ডে ছিল ৪৯৬ সালে। একটি নির্দিষ্ট দিনে ভ্যালেন্টাইন’স ডে পালনের বিষয়টি বেশ প্রাচীনকালের ঐতিহ্য, যা রোমান উৎসব থেকে উদ্ভূত বলে মনে করা হয়।

রোমানদের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে লুপারকালিয়া নামে একটি উৎসব ছিল – আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বসন্ত মৌসুম শুরু হওয়ার সময়। উদযাপনের অংশ হিসাবে ছেলেরা একটি বাক্স থেকে মেয়েদের নাম লেখা চিরকুট তোলেন। যে ছেলের হাতে যেই মেয়ের নাম উঠত, তারা দুজন ওই উৎসব চলাকালীন সময়ে বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড থাকতেন বলে মনে করা হয়। অনেক সময় ওই জুটিই বিয়েও সেরে ফেলতেন।

সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস ক্লডিয়াস ২১৪ থেকে ২৭০ সাল পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেছেন। তার শাসনামলে তিনি সৈন্যদের বিয়ে করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে যোদ্ধার কোনো পারিবারিক বন্ধন নেই, সে ততো বেশি সাহসী। কারণ তখন ওই যোদ্ধা তার জীবনের ঝুঁকি নিতে কম ভয় পায়। কথিত আছে যে ভ্যালেন্টাইন নামের একজন বিশপ, যিনি প্রেমে বিশ্বাস করতেন, তিনি সৈন্যদের বিয়ে দিয়ে তা উদযাপন করতেন, এভাবে তিনি তৎকালীন সাম্রাজ্যের ডিক্রিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ভ্যালেন্টাইন নামে আরেক ধার্মিক ব্যক্তিকে ঘিরে ভিন্ন ধরনের গল্প রয়েছে। ওই গল্প অনুযায়ী তিনি রাস্তায় রাস্তায় গোলাপ বিতরণ করতেন।

আরেকটি গল্প অনুসারে ভ্যালেন্টাইন নামে একজন কাগজে হৃদয় কেটে সৈন্যদের দিতেন, যাতে তারা সেই কার্ডগুলি দেখে তার প্রিয়জনকে মনে রাখতে পারে।

এমন গল্পও আছে যেখানে ভ্যালেন্টাইন নামে একজন ধর্মযাজক তার প্রভাবশালী আত্মীয়দের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি প্রেমের প্রকৃত অনুভূতি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

সেই উপলব্ধি থেকে তিনি একজন খ্রিস্টান তরুণ এবং তার প্যাগান বান্ধবীর মধ্যে মিলনকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে অর্থাৎ তাদের বিয়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন। প্যাগানরা মূলত বহু-ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন। যাদের সাথে খ্রিস্টানদের ব্যাপক বিরোধ ছিল।

ক্যাথলিক সেইন্টদের রেকর্ড অনুযায়ী, ভ্যালেন্টাইন নামে মোট ১১ জন সেইন্ট আছেন। তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন প্রেমের বার্তা ছড়ানোর জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন।

সেইন্টদের জীবনী বা হ্যাজিওগ্রাফি গবেষক, ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অফ সাও পাওলো (ইউনিফেস্প) এর গবেষক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হ্যাজিওগ্রাফি সোসাইটির সহযোগী থিয়াগো মায়েরকি এই তথ্য দিয়েছেন।

তিনি বলেন “এই তিনটি চরিত্র নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা দেয়, একজনের সাথে আরেকজনকে গুলিয়ে ফেলা হয়।”

গবেষক মায়েরকি আরও বলেছেন “গির্জা বা চার্চে যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনকে উদযাপন করা হয় তিনি, রোমের সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। তার সাথে একজন ডাক্তারের গল্পও মিলে যায় যিনি পরবর্তীতে একজন ধর্মযাজক হয়েছিলেন এবং সম্রাটের আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে সৈন্যদের বিয়ে দেয়া উদযাপন করেছিলেন। কিন্তু তার আসলেই কোনো অস্তিত্ব ছিল কি না, সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে।”

যদি একজন ভ্যালেন্টাইনকে আরেকজন ভ্যালেন্টাইন থেকে আলাদা করা কঠিন হয় তবে এটা প্রমাণ করা আরও কঠিন হবে যে সত্যিই কী ঘটেছে। সেইসাথে এই প্রশ্নও ওঠে যে শত শত বছর ধরে চর্চিত এই কিংবদন্তি চরিত্রের আদৌ কোনো অস্তিত্ব ছিল নাকি সবই মনগড়া?

যেহেতু ১৪ই ফেব্রুয়ারি উদযাপন করা চরিত্রটি নিয়ে ক্যাথলিক ধর্মে এতো বিতর্ক রয়েছে, ফলে বাস্তবতা কী এবং পৌরাণিক কাহিনী কী তা নিশ্চিত করতে না পারায় ক্যাথলিক চার্চ নিজেরাই তাদের প্রথাগত লিটার্জিকাল ক্যালেন্ডার থেকে ১৪ই ফেব্রুয়ারির উৎসবটিকে সরিয়ে দেয়। ১৯৬০ সালে দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিলের পরে তা করা হয়।

এত দ্বন্দ্বের মধ্যে, আসল ভ্যালেন্টাইনস ডে কী হতে পারে সেই তথ্য বিভিন্ন সূত্র দ্বারা নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। তৃতীয় শতকে রোমে বসবাস করেছেন, আবার সে সময় তৎকালীন সম্রাট ক্লডিয়াসের সরকারের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন এসব তথ্য থেকে ওই প্রেমের সেইন্টকে খুঁজে বের করা সম্ভব।

সেইন্টদের জীবনী বা মার্টায়রোলজিতে বলা হয়েছে, এই ইতিহাসের সাথে রোমের টাইবার নদীর উপর মিলভিয়ান সেতুর অস্তিত্ব জুড়ে আছে।

“এই সেতুটি প্রায় ২০৭ সাল থেকে আছে”, লিরা জোর দিয়ে বলেন। “এটি দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের সময়, ব্যাটেল অব মেটাউরোর ফিরে আসা উপলক্ষে নির্মাণ করা হয়েছিল।”

এটিও বিশ্বাস করা হয় যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন শহীদ হয়েছিলেন, তখনকার যুগে অনেক বিশিষ্ট খ্রিস্টানদের মেরে ফেলার বিষয়টি সাধারণ ছিল। বিশেষ করে রোম সাম্রাজ্যের আদেশ পালন না করলে তাদের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেয়া হতো।

তার মৃত্যুর তারিখ ১৪ই ফেব্রুয়ারি হওয়ার বিষয়টি সম্ভবত একটু দেরিতে সামনে এসেছে। এখানে চার্চ তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় একটি সুবিধাজনক সময় বেছে নিয়েছে।

 

উত্তর গোলার্ধে বসন্ত শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস আগে, প্রাচীন রোমে লুপারক্যালিয়া নামে একটি উৎসব হতো। এটি ছিল মূলত জমির উর্বরতা লাভের আশায় এক ধরনের আচার অনুষ্ঠান।

ভ্যাটিকানবাদী ডমিঙ্গুয়েসের মতে, এটি এমন এক সময় ছিল যখন ধর্মীয় আচার হিসাবে একজন আরেকজনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হতো। এর মাধ্যমে ফসল বপনের সময়কেও বোঝাতো এবং তারা এই উপায়ে দেবতাদের আশীর্বাদ চাইতো যাতে প্রচুর ফসল ফলে এবং একটি উর্বর বছর যায়।

ডিমিঙ্গুয়েস আরও বলেন, “তিনি সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনকে প্রেমিকদের, দম্পতিদের পৃষ্ঠপোষক প্রতিনিধি হিসাবে রাখেন।”

তবে আশ্চর্যজনকভাবে, যে উৎসবের আর্বিভাব হয়েছিল প্যাগানদের থেকে তা পরে খ্রিস্টধর্ম তাদের নিজেদের মতো করে উদযাপন করে।

তবে আজ এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন ভ্যাটিকানবাদী ডমিঙ্গুয়েস। “এখানে খ্রিস্টান সেইন্টের নাম ব্যবহার করা হলেও এটি খ্রিস্টানদের ছুটির দিন নয়।”

পরে সম্ভবত ভ্যালেন্টাইনের যে জীবনী তৈরি করা হয়েছিল– বা যতো ভ্যালেন্টাইনের কথা হচ্ছে, তাদের গল্পের পুরোটাই হয়তো কল্পকাহিনীতে পূর্ণ।

দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিল শুরুর সময় থেকে চার্চের একটি প্রচেষ্টা ছিল “সেইসব সেইন্টদের স্মৃতি মুছে ফেলা যারা একটি পৌরাণিক গল্প ছাড়া আর কিছুই ছিল না, এরপরও এক সময় তারা কিংবদন্তি চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন”, ব্যাখ্যা করেন গবেষক মায়েরকি।

সে যাই হোকনা কেন ভ্যালেন্টাইন বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে আামদের দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কোন সম্পর্ক নেই। তার পরেও মানুষ নিজেদের আবেগের তাড়নায় এবং এই দিবসটির মধ্যে একজন আরএকজেনর কাছে ভালোবাসা নিবেদন করে। এই ভালোবাসা সব বিভেদ ভুলে সব মানুষকে এক কাতারে দাঁড়া করিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে মানুষ দেশকে ভালো বাসতে শেখে। আর ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকৃতি থাকে নির্মল। গাছে গাছে ফুল ফোটে তাই মানুষ ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়। হিংস ভুলে  আমরা সবাইকে ভালো বাসবো এইটা যেন হয় বিশ্ব ভালোবাসা দিবেসের মূল মন্ত্র।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

পূর্ববর্তী জিম্মিদের মুক্তি না দিলে ফের গাজায় অভিযান চালানোর হবে: নেতানিয়াহু
পরবর্তী আমরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে যাচ্ছি: শান্ত