আধুনিক ফুটবলের কর্ণধার জার্মানির বেকেনবাওয়ার আর নেই

বেকেনবাওয়ার আর নেই - খেলাধুলা - ৯ জানুয়ারি ২০২৪ (ফাইল ছবি)
বেকেনবাওয়ার আর নেই - খেলাধুলা - ৯ জানুয়ারি ২০২৪ (ফাইল ছবি)

www.HelloBangla.News – খেলাধুলা – ৯ জানুয়ারি, ২০২৪: জার্মান কিংবদন্তি বেকেনবাওয়ারকে বলা হয় আধুনিক ফুটবলের জনক। বেকেনবাওয়ার মাঠে খেলেছেন মাঠের বাইরে থেকেও মেধা আর প্রজ্ঞা নিয়ে দলকে লড়াই করার উৎসাহ দিয়েছেন। বলা যায় ফুটবলকে রীতিমত বদলে দিয়েছেন তিনি।

এই জার্মানির হাতেই খুন হয়েছিল ইয়োহান ক্রুইফের ৭৪ সালের অনিন্দ্যসুন্দর টোটাল ফুটবল। আবার ১৯৯০ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার লাগাম টেনে ধরেছিল এই জার্মানিই। দুবারেই মাঠের ফুটবলের বাইরে মেধা ছিল একজনের। নাম তার ফ্রাঞ্চ বেকেনবাওয়ার। ৭৪ সালে ছিলেন খেলোয়াড় আর ৯০ এ কোচ। খেলোয়াড় আর কোচ দুই ভূমিকায় বিশ্বকাপ জিতেছেন কেবল তিনজন। এরমাঝে একজন জার্মানির বেকেনবাওয়ার। ফুটবল যিনি শুধু খেলেননি, রীতিমত বদলে দিয়েছেন।

সেই অনন্য ফুটবলার বেকেনবাওয়ার পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছেন গতকাল। পরিবারের পক্ষ থেকে গতকাল (স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১২ মিনিট) বিবৃতিতে তার মৃত্যুর খবর জানানো হয়।

জার্মানির সম্রাট দ্বিতীয় লুডভিগের মতোদেখতে হওয়ায় এক সাময়িকী বেকেনবাওয়ারের নাম দিয়েছিল ‘কাইজার।’ বাংলায় যা হয় সম্রাট। ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে আক্ষরিক অর্থেই জার্মানির ফুটবলে আর ফুটবল ভক্তদের মাঝে সম্রাট হয়ে ছিলেন এই ক্ষুরধার ব্যক্তিত্ব।

ব্রাজিলের ছিল পেলে। আর্জেন্টিনার ছিল ম্যারাডোনা। নেদারল্যান্ডসের ছিল ক্রুইফ। আর জার্মানির ছিল বেকেনবাওয়ার। জার্মানির এই ফুটবলারকে তর্কাতীত ভাবে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। তবে তার নিজ দেশের মানুষ মনে করেন, তিনিই সবার চেয়ে সেরা। বেকেনবাওয়ার ছাড়া আর কোনও বড় ফুটবলার নেই।

বেকেনবাওয়ার জার্মান ফুটবলের কতখানি জুড়ে আছেন, সেটা উয়েফার ‘এক্স’ পোস্ট থেকে বুঝে নেওয়া যায়, ‘…আর কেউ জার্মান ফুটবলকে তাঁর মতো এতটা পূর্ণতা দেননি।’

বলা হচ্ছিল, বেকেনবাওয়ার ফুটবলকে বদলে দিয়েছেন আজীবনের জন্য। ফুটবল মাঠে লিওনেল মেসির ফ্রি রোলের ফুটবলের কথা কে না জানে। সেই ফ্রি রোলের ফুটবল পৃথিবীকে প্রথম দেখিয়েছিলেন এই জার্মান মায়েস্ত্রা। সুইপার, লিবেরো… আরও কত কত শব্দের জন্মটা হয়েছে এই বেকেনবাওয়ারের কল্যাণে! ফরোয়ার্ডে গার্ড মুলার, গোলবারে সেপ মায়ার, মাঝমাঠে উলি হোয়েনেস আর রক্ষণে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। সত্তরের দশকে জার্মানি এবং বায়ার্ন মিউনিখে রাজত্বের কারিগর ছিলেন তারা। আর এই অদম্য দলের অধিনায়ক ছিল সদ্য প্রয়াত কিংবদন্তি।

মিউনিখের গিসলিংয়ের ১৯৪৫ সালে জন্ম নেন বেকেনবাওয়ার। বয়সভিত্তিক ফুটবলের জন্য বেছে নেন মিউনিখের আরেক ক্লাব বায়ার্নকেই। শুরুতে তিনি ছিলেন একজন সেন্টার ফরোয়ার্ড। বায়ার্নের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় ১৯৬৪ সালে। সে সময় বায়ার্ন আজকের মত নামী ক্লাব না। ক্লাবটি খেলত জার্মানির দ্বিতীয় সারির ক্লাবে। সেই বায়ার্নকে বুন্দেসলিগায় উঠে আসতে দারুণভাবে সহায়তাও করেন বেকেনবাওয়ার।

এরপর বাভারিয়ানদের হয়ে যা করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় অনায়াসে ঠাঁই দেওয়া যায়। ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে তিনি দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হন এবং দলটিকে প্রথমবারের মতো বুন্দেসলিগার শিরোপাও এনে দেন। ১৯৭২-৭৪ সালের মধ্যে দলকে ঘরোয়া লিগের হ্যাটট্রিক শিরোপাও এনে দেন। এ সময় ইউরোপিয়ান ফুটবলেও বায়ার্ন হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য এক দল। ১৯৭৪-৭৬–এর মধ্যে হ্যাটট্রিক ইউরোপিয়ান শিরোপা জেতা দল হয়ে যায় তারা। যার পেছনে বড় অবদান অধিনায়ক বেকেনবাওয়ারের।

ফুটবলের ব্যক্তিগত সম্মাননার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি বলা চলে ব্যালন ডি’ অরকে। শেষ কবে একজন ডিফেন্ডার এই খেতাব জিতেছেন, সেটা দেখতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০০৬ সালে। ডিফেন্ডারদের জন্য এই পুরস্কার পাওয়াই যেখানে কঠিন, সেখানে জার্মানির ফ্রাঞ্চ বেকেনবাওয়ার এই সম্মান জিতেছেন দুইবার।  ১৯৭২ ও ১৯৭৬ সালে ব্যালন ডি’অর জিতে নেন এই ডিফেন্ডার। ১৯৮৩ সালে যখন বুটজোড়া তুলে রাখছেন, ততদিনে তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। পেলের পাশে ম্যারাডোনা নয়, তখন তর্ক চলতো বেকেনবাওয়ারের নামে।

ফুটবলের জন্য তার মেধার কদর করতে ভোলেনি জার্মানি। ১৯৮৪ সালেই তার হাতে তুলে দেওয়া হয় জার্মানির দায়িত্ব। প্রথমবারেই দলকে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে যান বেকেনবাওয়ার। সেবার ডিয়েগো ম্যারাডোনার অতিমানবীয় ফুটবলের সঙ্গে সেবার পেরে ওঠেনি পশ্চিম জার্মানি। কিন্তু বেকেনবাওয়ার যেন হাল ছাড়ার পাত্র নন। চার বছর পর সেই আর্জেন্টিনাকে হারিয়েই কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতেন দ্য কাইজার।

বেকেনবাওয়ারের প্রস্থানে শোকাহত ফুটবল দুনিয়া। সেই শোক স্পর্শ করেছে লিওনেল মেসিকেও। জার্মান কিংবদন্তি এই ফুটবলারের প্রস্থানের পর নিজের ইন্সটাগ্রামে তার ছবি পোস্ট করেছেন মেসি। শোকের বার্তা হিসেবে লিখেছেন ‘শান্তিতে ঘুমাও।’

জার্মান কিংবদন্তির মৃত্যু স্পর্শ করেছে মেসির সতীর্থ এবং বিশ্বকাপজয়ী লেফট ব্যাক নিকোলাস টালিয়াফিকোকেও। জার্মানির জার্সি পরিহিত বেকেনবাওয়ারের ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার। শান্তিতে ঘুমাও কাইজার।

তাকে হারানোর ধাক্কাটা যে কত বিশাল তা বোঝা যায় শিষ্য লোথার ম্যাথাউসের কথাতেই, ‘যদিও আমি জানতাম ফ্রাঞ্জ খুব একটা সুস্থ ছিলেন না, কিন্তু তাকে হারানোর ধাক্কাটা বেশ গভীর। খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে তিনি অন্যতম সেরা, মাঠের বাইরেও…। শুধু ফুটবল নয়, ফুটবলের বাইরেও ফ্রাঞ্জ অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। সম্মান কুড়িয়েছেন বিশ্বব্যাপী। যারা তাকে চেনে তারা সবাই জানে ফ্রাঞ্জ মানুষ হিসেবে কতটা মহান ও উদার  ছিলেন। একজন ভালো বন্ধু আমাদের ছেড়ে চলে গেল। আমি তাকে মিস করব, আমরা সবাই তাকে মিস করব। ‘

পূর্ববর্তী ফিলিপাইনে ৬.৭ মাত্রার ভূমিকস্প আঘাত হেনেছে
পরবর্তী আমাদের রিজার্ভ ভালো অবস্থায় আছে: অর্থমন্ত্রী