
প্রযুক্তির অতি ব্যবহারের কারনে এক ধরনের জটিল মানসিক ভীতি, উদ্বিগ্নতা এবং উত্তেজনাপূর্ণ এক অনুভূতির প্রবনতা কাজ করে বেশিরভাগ মানুষের মাঝে যার নাম ফিয়ার অব মিসিং আউট (ফোমো)। এটি এমন একটি বিষয়, যা আপনার মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা বা হারানোর অনুভূতির জন্ম দেয় । এসব বেশিরভাগই সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়, যেমন আপনি ভাবছেন অন্যরা হয়তো আপনার অনুপস্থিতিতে অনেক মজা করছেন বা বন্ধুরা কে কি করছেন? অথবা, অন্যদের দেখে মনে হওয়া যে তারা আমার থেকে অনেক ভালো জীবনযাপন করছেন, অথচ আপনি তাদের মতো সুখী হতে পারছেন না ইত্যাদি।
মোটকথা, এটি আপনার মধ্যে এমন একটি অনুভূতির সৃষ্টি করে যে আপনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস করছেন। কিন্তু বাস্তবতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভিন্ন। ফোমোর ফলে ব্যক্তির মধ্যে সামাজিক অস্বস্তি, অসন্তোষ, বিষণ্নতা, চাপের অনুভূতি, হীনম্মন্যতা, হিংসা, একাকিত্ব এবং তীব্র ক্রোধের মতো গভীর অনুভূতির সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি এটি আপনার আত্মসম্মানকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফোমো একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা। বিপণন কৌশলবিদ ড্যান হারম্যান ১৯৯৬ সালে একটি গবেষণাপত্রে শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় পর্যবেক্ষণ করা একটি ঘটনা বর্ণনা করার জন্য ‘ফোমো’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ফোমোর অনুভূতি প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া পোস্টগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়। উদ্বেগটি আপনাকে বোঝায় যে একটি উত্তেজনাপূর্ণ বা আকর্ষণীয় ঘটনা বর্তমানে অন্য কোথাও ঘটছে, যেটি সম্পর্কে আপনি অনবরত খোঁজ না রাখলে পিছিয়ে পড়বেন।
মানুষ তাদের বাছাই করা সেরা ছবি দিয়ে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন, যা অন্যদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। নিজের মধ্যে কী কী অভাব রয়েছে, সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়িয়ে তোলে।
দ্য ওয়ার্ল্ড জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল কেস দ্বারা প্রকাশিত একটি ২০২১ সালের গবেষণায়, লেখক মায়াঙ্ক গুপ্তা এবং আদিত্য শর্মা লিখেছেন যে, যেকোনো ব্যক্তির জীবনযাপন ফোমোর কারনে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক ভূমিকায় পরিণত হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে:
ঘুমের অভাব, ব্যর্থ হতাশ জীবন, মানসিক উত্তেজনা, শারীরিক সুস্থতার উপর নেতিবাচক প্রভাব, উদ্বেগ, মানসিক নিয়ন্ত্রণের অভাব।
ফোমোর মতো প্রযুক্তিনির্ভর ভয়াবহ মানসিক ক্রাইসিস অল্প অল্প করে আমাদের জীবনকে নষ্ট করে তুলছে। এর থেকে রক্ষা পেতে আমরা প্রযুক্তিকে অস্বীকার করতে পারবো না আবার প্রযুক্তিকে পৃথিবীর থেকে উধাও করেও দিতে পারবো না। সুতরাং আমাদের সতর্ক হতে হবে যেন এমন ক্রাইসিসে আমাদের না পড়তে হয়। সেজন্য প্রথমেই দরকার –
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনঃ
আপনার কিসের অভাব রয়েছে, তার ওপর মনোযোগ দেয়ার পরিবর্তে আপনার কী আছে, সেদিকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করুন। আপনার কী নেই, সেই তালিকা যদি বেশি লম্বা করে ফেলেন, তাহলে নিজেকে অসুখী মনে হবে। তাই নিজের যা আছে, সেটার মধ্যে সুখ খোঁজার চেষ্টা করুন।
ডিজিটাল ডিটক্স করার চেষ্টা করুন
ডিজিটাল ডিটক্স মানে হচ্ছে- সব ডিজিটাল ডিভাইস থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিরতি নেয়ার প্রক্রিয়া। ফোমো থেকে দূরে থাকতে এবং আপনার বাস্তব জীবনের দিকে আগ্রহী হতে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার কমাতে হবে। এতে আপনার মধ্যে ফোমোর প্রবণতা কমে আসবে।
বাস্তব সম্পর্ক স্থাপন
বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় যেরকমভাবে একজন ব্যবহারকারী নিজেকে উপস্থাপন করে তার সাথে বাস্তব জীবনের সাথে অনেক সময়ই মিল থাকে না। আর আমরা প্রতিটি মানুষ বাস্তব দুনিয়ায় বাস করি এটা ভুলে যাওয়া যাবেনা। সব সময় যোগাযোগ ধরে রাখতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্বারস্থ হওয়া স্বাভাবিক মনে হলেও শুধু ভার্চুয়াল জগতের ওপর নির্ভরশীল না থেকে, বাস্তবে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করতে পারেন।
তথ্যসূত্রঃ ইউএসএটুডে
