বর্তমানে দেশে রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় একটি উৎস ভ্যাট ব্যবস্থা

বর্তমানে দেশে রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় একটি উৎস ভ্যাট ব্যবস্থা

হ্যালো বাংলা ডেস্ক: আজ বুধবার থেকে একাদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে। বাজেটে রাজস্ব আয়ে বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়। মনে রাখতে হবে বর্তমানে বাংলাদেশে রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় একটি উৎস ভ্যাট ব্যবস্থা । দেশে ৯০ এর দশকে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থা চালু হয়। মূসক চালুর সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত। আজ আমরা ভ্যাট সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় জেনে নেব।

চলতি অর্থ বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত মূসক বা ভ্যাট  আদায় করা হয়েছে ৮৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৪১৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। দেখা গেছে দেশের মোট আদায়কৃত রাজস্বের মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশই মূসক থেকে আদায় হওয়া অর্থ।

এরআগে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯৭ হাজার ৫০৯ কোটি টাকার ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আদায় হয়েছিল।

এই ভ্যাট গ্রহণ ও সরকারি কোষাগারে জনা দেওয়া নিয়ে নানা ধরণের অভিযোগ আছে, বলা হয় বাংলাদেশে ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের কাছ থেকে মূসক আদায় করলেও অনেকেই তা সরকারি কোষাগারে জমা করেন না। ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর বা মূসক হচ্ছে একটি পরোক্ষ কর।

কেননা কোন ক্রেতা যখন কোন পণ্য বা সেবা ক্রয় করেন, তার মূল্যের অতিরিক্ত যে কর তিনি দিয়ে থাকেন, সেটাই হচ্ছে ভ্যাট বা মূসক। এই করটি সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার দায়িত্ব বিক্রেতার।

মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট বা মূসক চালু করা হয় উনিশ’শ একানব্বই সালের পহেলা জুলাই থেকে।  প্রথমে অল্প কিছু পণ্যের উপর মূসক আরোপ করা হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে অধিকাংশ পণ্য এবং বেশ কিছু সেবা-পরিষেবা, আমদানী, পাইকারী ও খুচরা বিক্রয়কৃত পণ্যের মূসক আরোপ করা হয়। তাই এখন এটি সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় একটি উৎস।

মূসক আইন অনুযায়ী, সব ধরণের করযোগ্য আমদানি এবং করযোগ্য সরবরাহের উপর মূসক আরোপিত হয়। বাংলাদেশে পণ্য বা সেবার উপর ১৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপের নিয়ম রয়েছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেড় শতাংশ থেকে শুরু করে ১০ শতাংশ হারেও মূসক নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

ভ্যাটের যাত্রা শুরু ইউরোপে:

বিশ্বে ভ্যাট বা মূসকের যাত্রা শুরু মূলত ইউরোপে। এই তথ্য পাওয়া গেছে নিউইয়র্ক ভিত্তিক ফাইনান্সিয়াল মিডিয়া ওয়েবসাইট ইনভেস্টোপিডিয়ায়।  ফ্রান্সের কর কর্তৃপক্ষ ১৯৫৪ সালে প্রথম দেশ হিসেবে মূসক আরোপ করে। তবে এর প্রায় এক শতাব্দী আগে জার্মানিতে পণ্যের সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাপে কর দেয়ার রীতি প্রচলিত ছিল বলেও জানা যায়।

শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন এন্ড ডেভেলপমেন্টের বেশিরভাগ সদস্য দেশেই ভ্যাট ব্যবস্থা চালু ছিল।

বাংলাদেশে ভ্যাট বা মূসক চালুর তোড়জোর শুরু হয় ১৯৮৯ সালের দিকে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে। তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন অধ্যাপক ড. ওয়াহিদুল হক।

সেই সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থার ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টে যারা কর নীতি এবং সরকারের ব্যয় নিয়ে কাজ করে সেই বিভাগের সিনিয়র ইকোনমিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মি. মনসুর। তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালে দেশ জুড়ে প্রলয়ংকারী বন্যার পর, দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য কারিগরি সহায়তা দিতে আইএমএফকে আহ্বান জানিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অধ্যাপক ড. ওয়াহিদুল হক।

তার অনুরোধে রাজি হয় আইএমএফ। এর অংশ হিসেবে আইএমএফ এর একটি প্রতিনিধিদল ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সফর করে।

আইএমএফ-এর এমন উদ্যোগের কারণ হিসেবে মি. মনসুর বলেন, সেসময় বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের তুলনায় রাজস্ব আয় অনেক কম ছিল। সেটাকে বাড়ানোটা একটা লক্ষ্য ছিল। একই সাথে ভ্যাট তখন বিশ্বজুড়ে পরিক্ষীত এবং সফল একটি ব্যবস্থা ছিল। বিশ্বের প্রায় ৭০-৮০টি দেশে এই ব্যবস্থা চালু ছিল। যার কারণে বাংলাদেশেও একই ধরণের ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

আইএমএফ এর প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে সরকারের সাথে কাজ শুরু করে এবং এর অংশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত ও ফিলিপিন্সের মতো ভ্যাট চালু রয়েছে এমন কয়েকটি এশিয় দেশ সফর করে। সফর শেষে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভ্যাট চালু করার বিষয়ক পরবর্তী কার্যকলাপ শুরু হয়।

জানা গেছ্যে, ভ্যাট চালু করা নিয়ে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা শুরুর পর তারা এর বিরোধিতা করে। এমনকি দেশের জনগণও এটা শুরুতে মানতে চায়নি। এর প্রতিবাদ জানিয়ে তারা সেসময় এনবিআর বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবন বেশ কয়েক বার ঘেরাও পর্যন্ত করেছিল।

অবশ্য ভ্যাট চালু করার বিষয়ে তৎকালীন সরকার ইচ্ছুক ছিল বলে কাজ চলতে থাকে। রাজস্ব বোর্ডও তখন এ বিষয়ে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছিল। সব মিলিয়ে ১৯৯০ এর দিকে যখন ভ্যাট চালু সংক্রান্ত আইন তৈরির জন্য পার্লামেন্টে তোলার প্রস্তুতি চলছিল তখন জেনারেল এরশাদের সরকার পতন হয়। এমন অবস্থায় ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। এই সরকারের রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ।

পার্লামেন্ট না থাকার কারণে ভ্যাট সংক্রান্ত বিলটি তখন রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অধ্যাদেশ হিসেবে জারির প্রস্তাব তোলা হয়।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না। তার যুক্তি ছিল, তিনি অস্থায়ী সরকার প্রধান এবং তিন মাস পরেই ক্ষমতা থেকে সরে যাবেন। কিন্তু তিনি এই অধ্যাদেশ জারি করলে সেটি আইনে পরিণত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকবে।

পরে তিনি এই আদেশে সই করেন এবং পরে এটি অধ্যাদেশে পরিণত হয়। পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ভ্যাট অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করে ১৯৯১ সালের জুলাই মাস থেকে এটি চালু করেন। এখনও তা বহাল আছে এবং বর্তমানে রাজস্ব আয়ের সবথেকে বড় গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

পূর্ববর্তী পড়াশোনার জন্য আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে: শেখ হাসিনা
পরবর্তী টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় আসর থেকে বাংলাদেশ পাবে ১ লাখ ডলার