www.HelloBangla.News – খেলাধুলা – ৩০ জুন, ২০২৪: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এবার দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত। এই জয়ে ১৭ বছরের আক্ষেপ দূর করলো দেশটি। কপিল দেব ও মহেন্দ্র সিং ধোনির পর ভারতকে বিশ্বকাপ জেতানো তৃতীয় অধিনায়ক এখন রোহিত শর্মা। শেষ ওভারে ভারতকে জিততে ১৬ রান আটকাতে হতো। ঠিক সেই সময় হার্দিক ৮ রানে তুলে নেন দুই উইকেট। শেষ ওভারে প্রোটিয়াদের ৭ রানে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় শিরোপা ঘরে তুললো ভারত। এই জয়ে আনন্দ অশ্রু ঝরেছে ভারতীয় সব ক্রিকেটারদের!
গত এক বছরে আইসিসির তিনটি প্রতিযোগিতার ফাইনালে খেললো ভারত। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের পর ঘরের মাঠে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালেও হেরেছিল ভারত। এবার আরও একটি হারের মুখেই ছিল রোহিতের দল। ক্লাসেন ঝড়ের পর জয়ের সুবাস পাচ্ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু ডেথ ওভারে যশপ্রীত বুমরা ও হার্দিকের বোলিং এবং ডেভিড মিলারের নিশ্চিত ছক্কা সূর্যকুমার যেভাবে ক্যাচে পরিণত করলেন- তাতেই অপরাজিত থেকে ১১ বছরের ট্রফি খরা ঘুচালো ভারত।
শুধু ভারতেরই নয়, দ্রাবিড়ের অনেক আক্ষেপ, অতৃপ্তি ঘুচেছে। দলকে চ্যাম্পিয়ন করেই ভারতের কোচ হিসেবে দ্রাবিড়ের অধ্যায় শেষ হলো।
ভারত তৃতীয়বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলে দ্বিতীয় শিরোপা জিতেছে। অন্যদিকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ফাইনালে খেলে ট্রফি ছোঁয়া হলো না দক্ষিণ আফ্রিকার। শন পোলক, গ্রায়েম স্মিথ, এবি ডি ভিলিয়ার্স, জ্যাক ক্যালিস, হ্যানসি ক্রনিয়ের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক কিংবদন্তিরা যা পারেননি, সেটাই করে দেখিয়েছিলেন এইডেন মারক্রাম। প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকাকে ফাইনালে তুলে ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল প্রোটিয়ারা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে আবার নিজেদের চোকার্স নামটার সার্থকতা বজায় রাখলো দক্ষিণ আফ্রিকা।
গতকাল শনিবার রাতে বারবাডোসের ব্রিজটাউনের কেনসিংটন ওভালে আগে টস জিতে ব্যাটিং করে ভারত। নিজের সেরা ইনিংসটি যেন ফাইনালের জন্যই তুলে রেখেছিলেন কোহলি। সেমিফাইনাল পর্যন্ত ১০.৭১ গড়ে ৭৫ রান করেছিলেন তিনি। বারবাডোসে দলের বিপর্যয়ে ঢাল হয়ে খেলেছেন ৭৬ রানের অসাধারণ এক ইনিংস। দলও পেয়েছে ৭ উইকেটে ১৭৬ রানের ভালো সংগ্রহ। প্রোটিয়াদের জিততে হলে ইতিহাস গড়তে হতো। কেন না টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে এত রান তাড়া করে সফল হওয়ার ইতিহাস নেই।
১৭৭ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে দলীয় ১২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। ভারতের দুই পেসার শুরুতেই ফিরিয়ে দেন ওপেনার রিজা হেন্ডরিকস (৪) ও অধিনায়ক মার্করামকে (৪)। তৃতীয় উইকেটে ট্রিস্টান স্টাবসের (৩১) সঙ্গে ৫৮ রানের জুটি গড়ে দলকে চাপমুক্ত করেন কুইন্টন ডি কক। এরপর প্রোটিয়া ওপেনার ৩৬ রানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন ক্লাসেনের সঙ্গে। এই জুটিতেই জয়ের ভিত তৈরি করেছিল প্রোটিয়ারা। ডি কক ৩৯ রানে আউট হওয়ার পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেন ক্লাসেন। ডেভিড মিলারের সঙ্গে ২২ বলে ৪৫ রানের জুটি গড়ে ম্যাচটা প্রায় বের করে এনেছিলেন ক্লাসেন। অক্ষর প্যাটেলের করা ইনিংসের ১৫তম ওভারে ২ চার ও ২ ছয়ে ২৪ রান নিয়ে সমীকরণ ৩০ বলে ৩০ রানে নামিয়ে এনেছিলেন। সেখান থেকে ম্যাচটা জিততে পারেনি প্রোটিয়ারা। আবার প্রমাণ করলো, এখনও চোক থেকে বের হতে পারেনি তারা। হার্দিকের করা ইনিংসের ১৭তম ওভারের প্রথম বলে ক্লাসেন ফিরে গেলে বিপদে পড়ে যায় প্রোটিয়ারা। ক্লাসেন ২৭ বলে ২ চার ও ৫ ছয়ে খেলেন ৫২ রানের ইনিংস।
শেষ তিন ওভারে ২২ রান প্রয়োজন ছিল প্রোটিয়াদের। কিন্তু বুমরার ১৮তম ওভারে মাত্র ২ রান নিতে পারে তারা, হারায় একটি উইকেটও। এরপর ১৯তম ওভারে আর্শদীপ সিং ৪ রান খরচ করলে ম্যাচ ঝুঁকে যায় ভারতের দিকে। শেষ ওভারে জয়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার দরকার ছিল ১৬ রান। হার্দিকের ওভারে প্রথম বলে ছয় মারতে চেয়েছিলেন মিলার। কিন্তু বাউন্ডারিতে দুর্দান্ত এক ক্যাচে তাকে ফেরান সূর্যকুমার। পরে আর সমীকরণ মেলাতে পারেনি তারা।
২০১৩ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ের পর ঘুচলো ভারতের শিরোপা খরা। আর ২০০৭ সালে প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতার পর হাতে এলো আরেকটি শিরোপা। আর ২০১১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর বিশ্বমঞ্চে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেলো।
টসে জিতে ভারতের অধিনায়ক রোহিত ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কেন ব্যাটিং নিলেন সেটি প্রমাণ করতেই যেন ফাইনাল ম্যাচে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এলেন কোহলি। মার্কো ইয়ানসনের প্রথম ওভারে তিন চারে ঝলক শুরু করেন কোহলি। পরের ওভারে কেশব মহারাজকে প্রথম দুই বলে চার মেরে রোহিত আক্রমণাত্মক শুরু করেন। ১.২ ওভারেই ভারত তোলে ২৩ রান। এরপরই খেই হারান ব্যাটাররা।
মহারাজ তার চতুর্থ ও ষষ্ঠ বলে একে একে ফেরান রোহিত ও রিশাভ পান্তকে। ৫ বলে রোহিত ৯ রান করলেও পান্ত রানের খাতা খুলতে পারেননি। প্রোটিয়া স্পিনারকে সুইপ করতে গিয়ে ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে ক্লাসেনের দারুণ ক্যাচ হন ভারতের অধিনায়ক। পান্তও সুইপ করতে গিয়ে আকাশে বল তুলে দিয়ে বিদায় নেন ডি ককের তালুবন্দি হয়ে। এরপর ক্রিজে নামেন চলতি টুর্নামেন্টে ভারতের সবচেয়ে সফল ব্যাটার সূর্যকুমার যাদব। কিন্তু তিনিও ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যর্থ হয়েছেন। ফাইন লেগে উড়িয়ে খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দিয়েছেন। সেখানেও ক্যাচটি নেন ক্লাসেন। ১১ রানের ব্যবধানে ৩ উইকেট হারিয়ে ভীষণ চাপে পড়ে ভারত।
সেই চাপ থেকে দলকে উদ্ধার করার গুরু দায়িত্ব পড়ে পুরো টুর্নামেন্টে ব্যাট হাতে ব্যর্থ হওয়া কোহলির ওপর। সেই দায়িত্বটা খুব ভালো করেই সামাল দিয়েছেন তিনি। ম্যাচআপের অংশ হিসেবে অক্ষর প্যাটেলকে নামানো হয় চার নম্বরে। ঠিক যে কারণে অক্ষরকে নামানো হয়েছে, সেই দায়িত্বটা ঠিকঠাকভাবেই করেছেন স্পিনিং এই অলরাউন্ডার। চতুর্থ উইকেটে ৫৪ বলে ৭২ রানের জুটি গড়েন এই দুজন।
১৪তম ওভারে অক্ষর রানআউট হলে ভাঙে এই জুটি। রাবাদার বলে ফ্লিক করতে যান কোহলি। কিন্তু ঠিকঠাক টাইমিং হয়নি, বল থাকে উইকেটরক্ষকের কাছাকাছি। এর মধ্যে রান নেওয়ার চেষ্টা করেন অক্ষর, কিন্তু কোহলি ফিরিয়ে দেন তাকে। ফেরার জন্য যথেষ্ট সময় পেলেও দ্রুততা ছিল না অক্ষরের। উইকেটরক্ষকের জায়গা থেকে সরাসরি থ্রোতে নন স্ট্রাইক প্রান্তে স্টাম্প ভাঙেন ডি কক। ৩১ বলে ১টি চার ও চারটি ছক্কায় ৪৭ রান করে সাজঘরে ফেরত যান অক্ষর।
তার বিদায়ের পর হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন কোহলি। এই টুর্নামেন্টে প্রথমবার এই মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। আগের সাত ইনিংসে স্রেফ ৭৫ রান করেছিলেন, দুবার আউট হয়েছিলেন শূন্য রানে। ফাইনালে ৪৮ বলে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন কোহলি।
ফিফটি পাওয়ার পর কিছুটা চালিয়ে খেলার চেষ্টা করেন কোহলি। হাফ সেঞ্চুরি পাওয়ার পরের ১১ বলে ১৬ রান আসে তার ব্যাট থেকে। মার্কো ইয়ানসেনের আগের বলে ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন। পরেরটি একটু স্লো করেন তিনি, এবার পুল করতে গিয়ে ক্যাচ দেন রাবাদার হাতে।
কোহলির সঙ্গে পরে পঞ্চাশ পেরোনো জুটি হয়েছিল দুবেরও। ইনিংসের দুই বল বাকি থাকতে আউট হন দুবে। ১৬ বলে ৩টি চার ও ১টি ছক্কায় ২৭ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি। শেষ বলে জাদেজাও আউট হন। তবে ততক্ষণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান করে ফেলেছে ভারত। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করা অস্ট্রেলিয়ার ১৭৩ রান টপকে তারা করে ১৭৬ রান।
পুরো টুর্নামেন্টে রানের জন্য ছটফট করেছিলেন কোহলি। সবকিছুই যেন তুলে রেখেছিলেন ফাইনালের জন্য। নেমেই এক ওভারে তিন চারে দারুণ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। তবে দ্রুত তিন উইকেট হারানোর পর দলের পরিকল্পনাতেই হোক কিংবা প্রোটিয়া বোলারদের তোপেই হোক, একটু যেন খোলসবন্দি হয়ে যান। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই আগ্রাসী ব্যাটিং করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য টিকতে পারেননি তিনি, ১৯তম ওভারে ইয়ানসেনের শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন। তার আগে ৫৯ বলে ৭৬ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে কিং কোহলি খ্যাত ভারতীয় এই ব্যাটার। শেষ পর্যন্ত ভারত পায় ৭ উইকেটে ১৭৬ রানের বড় স্কোর।
প্রোটিয়া বোলারদের মধ্যে আনরিখ নর্কিয়া ২৬ রান দিয়ে ২টি উইকেট শিকার করেছেন। এছাড়া মহারাজ ২৩ রান দিয়ে নিয়েছেন ২ উইকেট। ইয়ানসেন ও কাগিসো রাবাদা একটি করে উইকেট নেন।
বিরাট কোহলি ম্যাচসেরা পুরস্কার নিতে এসেই ঘোষণা দেন, ‘এটাই ছিল ভারতের হয়ে আমার শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ।’ সংবাদ সম্মেলনে এলো আরেক তারকার অবসরের ঘোষণা। ভারতকে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতিয়ে এই ফরম্যাট থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিলেন অধিনায়ক রোহিত শর্মা।










