www.HelloBangla.News – মতামত – ৬ মার্চ, ২০২৪: ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এসেছিল এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে। সেদিনের ১৮ মিনিটের ভাষণে শেখ মুজিব বলেছিলেন ”এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম”। ওই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ” ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকো”। অনেকেই বিশ্বাস করেন এই বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান একটা গেরিলা মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
জনসভায় ছিলেন এমন অনেকে বলেছেন, লাঠি, ফেস্টুন হাতে লাখ লাখ মানুষ উত্তপ্ত শ্লোগানে মুখরিত থাকলেও শেখ মুজিবের ভাষণের সময় সেখানে ছিল পিনপতন নিরবতা।
এই ভাষণের বাস্তবতা এতটাই ব্যঞ্জনাময় ছিলো যা সবার হৃদয়কে স্পর্শ করেছিলো। সেই সময়ের বাস্তবতার নিরিখে তা হয়ে পড়েছিল বাঙালি জনগোষ্টির কাছে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকার কালজয়ী আহ্বন।
ভাষণ শেষে আবার স্বাধীনতার পক্ষে শ্লোগান মুখর হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাস্তাগুলো।
১ মার্চের পরের ঘটনা
১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রেডিওতে ভাষণের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন। সাথে সাথে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অফিস-আদালত, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অনেকে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য রাস্তায় নেমে আসে। সেদিন শেখ মুজিবুর হোটেল পূর্বানীতে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক করছিলেন।
রেডিওতে ঘোষণা শোনার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও নানা জায়গা থেকে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসলো। হোটেল পূর্বানীর চারপাশ তখন লোকে-লোকারণ্য। কারণ, অনেকই জানতো শেখ মুজিবুর রহমান সেখানে বৈঠক করছেন। মার্চ মাসের দুই তারিখে ঢাকায় এবং তিন তারিখে সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়া হলো। এছাড়া মার্চ মাসের চার তারিখ থেকে ছয় তারিখ পর্যন্ত দেশজুড়ে স্বতঃ:স্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। মার্চ মাসের চার তারিখ থেকে ছয় তারিখ পর্যন্ত ঢাকায় প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত হরতাল চলতে থাকে।
এমন অবস্থায় ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্র নেতারা।
পরিস্থিতি তখন আর পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। তিনি যা বলছিলেন, সেটাই ছিল শিরোধার্য। আন্দোলন এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিয়েই শেখ মুজিব ৩রা মার্চ পল্টনে ছাত্র সমাবেশে ৭ই মার্চ ভাষণ দেয়ার ঘোষণা করেছিলেন।
অন্যদিকে মার্চ মাসের তিন ও চার তারিখ রাত আটটা থেকে কারফিউ জারি করে সরকার। তখন কারফিউ অগ্রাহ্য করে মানুষ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে।
১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ ঢাকার সোহরাওর্দি উদ্যানে শেখ মুজিবের ভাষণকে দেখা হয় প্রথম স্বাধীনতার ডাক হিসাবে।
অন্যদিকে মার্চ মাসের তিন ও চার তারিখ রাত আটটা থেকে কারফিউ জারি করে সরকার। তখন কারফিউ অগ্রাহ্য করে মানুষ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে।
ইতোমধ্যে অনেক ঘটনা ঘটেছে। মিটিং, মিছিল ও কারফিউর তীব্রতা বেড়েছে। পুলিশের গুলিতে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন।
এর প্রেক্ষিতে ৬ মার্চে আওয়ামী লীগের শির্ষ পর্যায়ের নেতারা কেউ বলছেন, উনি আগামীকাল স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। কেউ বলছে, তা কী করে হবে? উনি নির্বাচনে জিতে গণপ্রতিনিধি, মেজরিটি পার্টির লিডার, উনি দাবির জোরে সরকার গঠন করবেন, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করবেন। এখন স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে সেটা তো রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়বে।
সাতই মার্চের আগে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাসভবনে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। সে বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ছিল, রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে শেখ মুজিব কোন পথ অনুসরণ করবেন।
গুরুত্বপূর্ণ সে বৈঠকে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য ছিল স্বাধীনতা ঘোষণার সময় এখনো আসেনি। মানুষকে এমন রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে নিয়ে আসার আগে জনসচেতনতা আরো সংহত করা প্রয়োজন।
দেখা গেল বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনের সেরা কর্তৃত্বব্যঞ্জক ভাষণ দিয়েছেন। যেখানে স্বাধীনতা ঘোষণা না করেও তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দেন স্বাধীনতার লড়াইয়ে নিজেকে সমর্পণের জন্য প্রস্তুত হতে হবে বাঙালিকে।
সাতই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণকে ঘিরে পাকিস্তান সরকারের মধ্যেও নানা চিন্তা ও উদ্বেগ কাজ করছিল। তাদের ধারণা ছিল, সেদিন শেখ মুজিবুর রহমান হয়তো স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বসতে পারেন।
শেখ মুজিব যাতে সে রকম কিছু না করেন, সেজন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনীর দিক থেকে নানা প্রচেষ্টা ছিল।
শেখ মুজিবুর রহমান টেলিফোনে ইয়াহিয়া খানকে বলেন যে আন্দোলন চলার সময় যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন, সেটির জন্য আন্তরিক দুঃখ এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।
শেখ মুজিবের সাথে টেলিফোনে আলাপের পর ইয়াহিয়া খান একটি টেলিপ্রিন্টার মেসেজ পাঠিয়েছিলেন শেখ মুজিবের জন্য। সেই মেসেজে ইয়াহিয়া খান লিখেছিলেন, দয়া করে তাড়াহুড়া করে কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি শীঘ্রই ঢাকা আসবো এবং আপনার সাথে বিস্তারিত আলাপ করবো। আমি আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে জনগণের প্রতি আপনার যে প্রতিশ্রুতি এবং আকাঙ্ক্ষা সেটির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা দেখানো হবে।
৭ই মার্চ সকালে পাকিস্তানে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত জোসেফ সিম্পসন ফারল্যান্ড শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন।
মার্চ মাসের শুরু থেকে পাকিস্তান সরকার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্যদের এনে ঢাকায় জড়ো করতে থাকে। সাতই মার্চের জনসভায় শেখ মুজিব যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তাহলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারা বলেছিলেন। ১৯৭১ সালে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪তম ডিভিশনের জিওসি ছিলেন মেজর জেনারেল খাদিম হুসেইন রাজা।
‘অ্যা স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওউন কান্ট্রি’ বইতে মি. রাজা তার বইতে এর বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ৬ই মার্চ আওয়ামী লীগের দুই ব্যক্তি তার সাথে দেখা করতে এসেছিল।
জেনারেল রাজা দাবি করেন, সেই ব্যক্তিদের তিনি বলেছিলেন, ক্যান্টনমেন্টে সৈন্যরা অস্ত্র ও ট্যাঙ্ক নিয়ে তৈরি আছে। রেসকোর্স ময়দান থেকে তিনি সরাসরি শেখ মুজিবের ভাষণ শোনার ব্যবস্থাও রেখেছেন। শেখ মুজিব যদি পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে আক্রমণ করে এবং একতরফাভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় তাহলে সৈন্যরা সাথে সাথে জনসভার দিকে অগ্রসর হবে এবং সেখানে হামলা চালাবে।
“প্রয়োজনে ঢাকা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে,” এমন কথা জেনারেল রাজা উল্লেখ করেছেন তার বইতে।
৭ই মার্চ পরিস্থিতি
সাতই মার্চ সকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ছিল লোকে-লোকারণ্য । এ অবস্থা এর আগে থেকেই অবশ্য চলমান ছিল। আওয়ামী লীগ নেতা ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সকাল থেকেই সেখানে জমায়েত হতে থাকেন। জনসভার বিষয় নিয়ে তিনি নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করেন।
এরপর তিনি সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে একটি বৈঠক করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন – সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ.এই.এম. কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, তাজউদ্দিন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও ড. কামাল হোসেন।
বৈঠক শেষে শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বলেন যে, তারা বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – রেসকোর্সের জনসভায় চার দফা ঘোষণা দেয়া হবে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ছাত্র-জনতার দাবির প্রতি সংহতি রেখে এ ঘোষণা দেয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এরপর এই চার-দফার একটি খসড়া প্রস্তুত করে ড. কামাল হোসেন শেখ মুজিবুর রহমানের অনুমোদন নেন। তার অনুমোদনের পর সেটি টাইপ করা হয়।
সেদিন রেসকোর্স ময়দানে নৌকা আকৃতির মতো করে জনসভার মঞ্চ করা হয়েছিল। সকাল থেকেই লাখো মানুষ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের দিকে যেতে থাকে। পুরো রেসকোর্স ময়দান ও তার আশপাশের এলাকা একবারে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিকেল চারটার পর শেখ মুজিবুর রহমান সভাস্থলে আসেন। সে ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান অহিংস এবং অসহযোগ আন্দোলন আরও জোরদার করার আহবান জানান।
একই সাথে তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রতি চারটি দাবি তুলে ধরেন।
১. অবিলম্বে মার্শাল ল প্রত্যাহার করতে হবে
২. জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে
৩. সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে
৪. সেনাবাহিনীর গুলি বর্ষণ ও মানুষ হত্যার ঘটনা তদন্ত করতে হবে
৭ই মার্চের সেই ভাষণ তিনি নিজের চিন্তা থেকেই দিয়েছিলেন। ভাষণটি লিখিত ছিলো না।
রেসকোর্সে ৭ই মার্চের বহু প্রত্যাশিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ঘোষণা করলেন – “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
সে বিশাল সমাবেশ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনোভাব দেখে বেশ চিন্তায় পড়ে যায় পাকিস্তান সরকার। একই সাথে তারা বুঝতে পারে শেখ মুজিবের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্চ রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ সে ভাষণ শোনার জন্য রেসকোর্স ময়দানে এসেছিলেন।
কত দূর-দূরান্তর থেকে যে লোক এসেছিল মিছিল করে, লাঠি আর রড ঘাড়ে করে – তার আর লেখাজোখা নেই। টঙ্গী, জয়দেবপুর ডেমরা – এসব জায়গা থেকে তো বটেই, চব্বিশ ঘণ্টার পায়ে হাঁটা পথ পেরিয়ে ঘোড়াশাল থেকেও বিরাট মিছিল এসেছিল গামছায় চিড়ে-গুড় বেঁধে। অন্ধ ছেলেদের মিছিল করে মিটিংয়ে আসে। বহু মহিলা, ছাত্রী মিছিল করে মাঠে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শুনতে।
রেসকোর্স ময়দানে মানুষের যে জোয়ার এসেছিল সেটি জনসভা শেষে ভাটার মতো মিলিয়ে গেল। মানুষজনকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন কোন মসজিদ বা চার্চের ধর্মীয় জমায়েত থেকে ফিরছে, যেখানে তারা সন্তুষ্টির বাণী শুনেছে।
সাতই মার্চ ভাষণের পর শেখ মুজিবুর রহমান আশঙ্কা করছিলেন যে তার ওপর যে কোন সময় পাকিস্তানী বাহিনীর পদক্ষেপ আসতে আসতে পারে। এ বিষয়টি তিনি পারিবারিক মহলেও বলেছিলেন।
৭ই মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, রেহানা, রাসেল, শেখ শহীদ, শাশুড়ি ও আমাকে নিয়ে খাওয়ার সময় গম্ভীর হয়ে বললেন, আমার যা বলার ছিল তা আজকের জনসভায় প্রকাশ্যে বলে ফেলেছি। সরকার এখন আমাকে যে কোন মুহূর্তে গ্রেফতার বা হত্যা করতে পারে। সেজন্য আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন দু’বেলা আমার সঙ্গে একত্রে খাবে।
শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চ ভাষণের পর তাঁর নির্দেশে শুরু হয় পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন। এরপর থেকে শেখ মুজিবুর রহামনের নির্দেশে চলতে থাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান।
৭ই মার্চ সরকারের এক তথ্য বিররণীতে বলা হয়, সপ্তাহ-জুড়ে সহিংসতায় ১৭২ জন নিহত এবং ৩৫৮জন আহত হয়। এদের মধ্যে ৭৮ জন নিহত হয় চট্টগ্রামে বিক্ষোভকারীদের নিজেদের মধ্যে সংঘাতে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা










