Category: মতামত

  • বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা

    বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা

    www.HelloBangla.News – মতামত – ৬ মার্চ, ২০২৪: ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এসেছিল এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে। সেদিনের ১৮ মিনিটের ভাষণে শেখ মুজিব বলেছিলেন ”এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম”। ওই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ” ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকো”। অনেকেই বিশ্বাস করেন এই বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান একটা গেরিলা মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

    জনসভায় ছিলেন এমন অনেকে বলেছেন, লাঠি, ফেস্টুন হাতে লাখ লাখ মানুষ উত্তপ্ত শ্লোগানে মুখরিত থাকলেও শেখ মুজিবের ভাষণের সময় সেখানে ছিল পিনপতন নিরবতা।

    এই ভাষণের বাস্তবতা এতটাই ব্যঞ্জনাময় ছিলো যা সবার হৃদয়কে স্পর্শ করেছিলো। সেই সময়ের বাস্তবতার নিরিখে তা হয়ে পড়েছিল বাঙালি জনগোষ্টির কাছে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকার কালজয়ী আহ্বন।

    ভাষণ শেষে আবার স্বাধীনতার পক্ষে শ্লোগান মুখর হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাস্তাগুলো।

     

    ১ মার্চের পরের ঘটনা

    ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রেডিওতে ভাষণের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন। সাথে সাথে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অফিস-আদালত, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অনেকে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য রাস্তায় নেমে আসে। সেদিন শেখ মুজিবুর হোটেল পূর্বানীতে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক করছিলেন।

    রেডিওতে ঘোষণা শোনার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও নানা জায়গা থেকে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসলো। হোটেল পূর্বানীর চারপাশ তখন লোকে-লোকারণ্য। কারণ, অনেকই জানতো শেখ মুজিবুর রহমান সেখানে বৈঠক করছেন। মার্চ মাসের দুই তারিখে ঢাকায় এবং তিন তারিখে সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়া হলো। এছাড়া মার্চ মাসের চার তারিখ থেকে ছয় তারিখ পর্যন্ত দেশজুড়ে স্বতঃ:স্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। মার্চ মাসের চার তারিখ থেকে ছয় তারিখ পর্যন্ত ঢাকায় প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত হরতাল চলতে থাকে।

    এমন অবস্থায় ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্র নেতারা।

    পরিস্থিতি তখন আর পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। তিনি যা বলছিলেন, সেটাই ছিল শিরোধার্য। আন্দোলন এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিয়েই শেখ মুজিব ৩রা মার্চ পল্টনে ছাত্র সমাবেশে ৭ই মার্চ ভাষণ দেয়ার ঘোষণা করেছিলেন।

    অন্যদিকে মার্চ মাসের তিন ও চার তারিখ রাত আটটা থেকে কারফিউ জারি করে সরকার। তখন কারফিউ অগ্রাহ্য করে মানুষ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে।

    ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ ঢাকার সোহরাওর্দি উদ্যানে শেখ মুজিবের ভাষণকে দেখা হয় প্রথম স্বাধীনতার ডাক হিসাবে।

     

    অন্যদিকে মার্চ মাসের তিন ও চার তারিখ রাত আটটা থেকে কারফিউ জারি করে সরকার। তখন কারফিউ অগ্রাহ্য করে মানুষ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে।

    ইতোমধ্যে অনেক ঘটনা ঘটেছে। মিটিং, মিছিল ও কারফিউর তীব্রতা বেড়েছে। পুলিশের গুলিতে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন।

    এর প্রেক্ষিতে ৬ মার্চে আওয়ামী লীগের শির্ষ পর্যায়ের নেতারা কেউ বলছেন, উনি আগামীকাল স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। কেউ বলছে, তা কী করে হবে? উনি নির্বাচনে জিতে গণপ্রতিনিধি, মেজরিটি পার্টির লিডার, উনি দাবির জোরে সরকার গঠন করবেন, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করবেন। এখন স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে সেটা তো রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়বে।

    সাতই মার্চের আগে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাসভবনে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। সে বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ছিল, রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে শেখ মুজিব কোন পথ অনুসরণ করবেন।

    গুরুত্বপূর্ণ সে বৈঠকে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য ছিল স্বাধীনতা ঘোষণার সময় এখনো আসেনি। মানুষকে এমন রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে নিয়ে আসার আগে জনসচেতনতা আরো সংহত করা প্রয়োজন।

    দেখা গেল বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনের সেরা কর্তৃত্বব্যঞ্জক ভাষণ দিয়েছেন। যেখানে স্বাধীনতা ঘোষণা না করেও তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দেন স্বাধীনতার লড়াইয়ে নিজেকে সমর্পণের জন্য প্রস্তুত হতে হবে বাঙালিকে।

    সাতই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণকে ঘিরে পাকিস্তান সরকারের মধ্যেও নানা চিন্তা ও উদ্বেগ কাজ করছিল। তাদের ধারণা ছিল, সেদিন শেখ মুজিবুর রহমান হয়তো স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বসতে পারেন।

    শেখ মুজিব যাতে সে রকম কিছু না করেন, সেজন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনীর দিক থেকে নানা প্রচেষ্টা ছিল।

    শেখ মুজিবুর রহমান টেলিফোনে ইয়াহিয়া খানকে বলেন যে আন্দোলন চলার সময় যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন, সেটির জন্য আন্তরিক দুঃখ এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।

    শেখ মুজিবের সাথে টেলিফোনে আলাপের পর ইয়াহিয়া খান একটি টেলিপ্রিন্টার মেসেজ পাঠিয়েছিলেন শেখ মুজিবের জন্য। সেই মেসেজে ইয়াহিয়া খান লিখেছিলেন, দয়া করে তাড়াহুড়া করে কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি শীঘ্রই ঢাকা আসবো এবং আপনার সাথে বিস্তারিত আলাপ করবো। আমি আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে জনগণের প্রতি আপনার যে প্রতিশ্রুতি এবং আকাঙ্ক্ষা সেটির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা দেখানো হবে।

    ৭ই মার্চ সকালে পাকিস্তানে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত জোসেফ সিম্পসন ফারল্যান্ড শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন।

     

    মার্চ মাসের শুরু থেকে পাকিস্তান সরকার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্যদের এনে ঢাকায় জড়ো করতে থাকে। সাতই মার্চের জনসভায় শেখ মুজিব যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তাহলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারা বলেছিলেন। ১৯৭১ সালে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪তম ডিভিশনের জিওসি ছিলেন মেজর জেনারেল খাদিম হুসেইন রাজা।

    ‘অ্যা স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওউন কান্ট্রি’ বইতে মি. রাজা তার বইতে এর বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ৬ই মার্চ আওয়ামী লীগের দুই ব্যক্তি তার সাথে দেখা করতে এসেছিল।

    জেনারেল রাজা দাবি করেন, সেই ব্যক্তিদের তিনি বলেছিলেন, ক্যান্টনমেন্টে সৈন্যরা অস্ত্র ও ট্যাঙ্ক নিয়ে তৈরি আছে। রেসকোর্স ময়দান থেকে তিনি সরাসরি শেখ মুজিবের ভাষণ শোনার ব্যবস্থাও রেখেছেন। শেখ মুজিব যদি পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে আক্রমণ করে এবং একতরফাভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় তাহলে সৈন্যরা সাথে সাথে জনসভার দিকে অগ্রসর হবে এবং সেখানে হামলা চালাবে।

    “প্রয়োজনে ঢাকা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে,” এমন কথা জেনারেল রাজা উল্লেখ করেছেন তার বইতে।

     

    ৭ই মার্চ পরিস্থিতি

    সাতই মার্চ সকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ছিল লোকে-লোকারণ্য । এ অবস্থা এর আগে থেকেই অবশ্য চলমান ছিল। আওয়ামী লীগ নেতা ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সকাল থেকেই সেখানে জমায়েত হতে থাকেন। জনসভার বিষয় নিয়ে তিনি নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করেন।

    এরপর তিনি সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে একটি বৈঠক করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন – সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ.এই.এম. কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, তাজউদ্দিন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও ড. কামাল হোসেন।

    বৈঠক শেষে শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বলেন যে, তারা বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – রেসকোর্সের জনসভায় চার দফা ঘোষণা দেয়া হবে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ছাত্র-জনতার দাবির প্রতি সংহতি রেখে এ ঘোষণা দেয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

    এরপর এই চার-দফার একটি খসড়া প্রস্তুত করে ড. কামাল হোসেন শেখ মুজিবুর রহমানের অনুমোদন নেন। তার অনুমোদনের পর সেটি টাইপ করা হয়।

    সেদিন রেসকোর্স ময়দানে নৌকা আকৃতির মতো করে জনসভার মঞ্চ করা হয়েছিল। সকাল থেকেই লাখো মানুষ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের দিকে যেতে থাকে। পুরো রেসকোর্স ময়দান ও তার আশপাশের এলাকা একবারে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিকেল চারটার পর শেখ মুজিবুর রহমান সভাস্থলে আসেন। সে ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান অহিংস এবং অসহযোগ আন্দোলন আরও জোরদার করার আহবান জানান।

    একই সাথে তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রতি চারটি দাবি তুলে ধরেন।

    ১. অবিলম্বে মার্শাল ল প্রত্যাহার করতে হবে

    ২. জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে

    ৩. সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে

    ৪. সেনাবাহিনীর গুলি বর্ষণ ও মানুষ হত্যার ঘটনা তদন্ত করতে হবে

    ৭ই মার্চের সেই ভাষণ তিনি নিজের চিন্তা থেকেই দিয়েছিলেন। ভাষণটি লিখিত ছিলো না।

    রেসকোর্সে ৭ই মার্চের বহু প্রত্যাশিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ঘোষণা করলেন – “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

    সে বিশাল সমাবেশ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনোভাব দেখে বেশ চিন্তায় পড়ে যায় পাকিস্তান সরকার। একই সাথে তারা বুঝতে পারে শেখ মুজিবের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্চ রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

    দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ সে ভাষণ শোনার জন্য রেসকোর্স ময়দানে এসেছিলেন।

    কত দূর-দূরান্তর থেকে যে লোক এসেছিল মিছিল করে, লাঠি আর রড ঘাড়ে করে – তার আর লেখাজোখা নেই। টঙ্গী, জয়দেবপুর ডেমরা – এসব জায়গা থেকে তো বটেই, চব্বিশ ঘণ্টার পায়ে হাঁটা পথ পেরিয়ে ঘোড়াশাল থেকেও বিরাট মিছিল এসেছিল গামছায় চিড়ে-গুড় বেঁধে। অন্ধ ছেলেদের মিছিল করে মিটিংয়ে আসে। বহু মহিলা, ছাত্রী মিছিল করে মাঠে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শুনতে।

    রেসকোর্স ময়দানে মানুষের যে জোয়ার এসেছিল সেটি জনসভা শেষে ভাটার মতো মিলিয়ে গেল। মানুষজনকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন কোন মসজিদ বা চার্চের ধর্মীয় জমায়েত থেকে ফিরছে, যেখানে তারা সন্তুষ্টির বাণী শুনেছে।

     

    সাতই মার্চ ভাষণের পর শেখ মুজিবুর রহমান আশঙ্কা করছিলেন যে তার ওপর যে কোন সময় পাকিস্তানী বাহিনীর পদক্ষেপ আসতে আসতে পারে। এ বিষয়টি তিনি পারিবারিক মহলেও বলেছিলেন।

    ৭ই মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, রেহানা, রাসেল, শেখ শহীদ, শাশুড়ি ও আমাকে নিয়ে খাওয়ার সময় গম্ভীর হয়ে বললেন, আমার যা বলার ছিল তা আজকের জনসভায় প্রকাশ্যে বলে ফেলেছি। সরকার এখন আমাকে যে কোন মুহূর্তে গ্রেফতার বা হত্যা করতে পারে। সেজন্য আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন দু’বেলা আমার সঙ্গে একত্রে খাবে।

    শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চ ভাষণের পর তাঁর নির্দেশে শুরু হয় পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন। এরপর থেকে শেখ মুজিবুর রহামনের নির্দেশে চলতে থাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান।

    ৭ই মার্চ সরকারের এক তথ্য বিররণীতে বলা হয়, সপ্তাহ-জুড়ে সহিংসতায় ১৭২ জন নিহত এবং ৩৫৮জন আহত হয়। এদের মধ্যে ৭৮ জন নিহত হয় চট্টগ্রামে বিক্ষোভকারীদের নিজেদের মধ্যে সংঘাতে।

    সূত্র: বিবিসি বাংলা 

  • ভ্যালেন্টাইন নিয়ে গল্পের পেছনে গল্প

    ভ্যালেন্টাইন নিয়ে গল্পের পেছনে গল্প

    www.HelloBangla.News – মতামত – ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪: বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালিত হয়  সাধারণত সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের এক ব্যক্তির উদার মানবিক বন্ধকে শ্রদ্ধা জানিয়ে। কিন্তু এই ভ্যালেন্টাইন ব্যক্তির কোন অস্তিত্ব আছে কি না তা নিয়ে এখন শুরু হয়েছে নানা চর্চা ও গবেষণা। জানা গেছে রেমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস ক্লাডিয়াস ২১৪ থেকে ২৭০ পর্যন্ত এমন এক শাসক ছিলেন যিনি তার শাসনামলে তিনি সৈন্যদের বিয়ে করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।

    তিনি অনুভব করেছিলেন যে যোদ্ধার কোনো পারিবারিক বন্ধন নেই, সে ততো বেশি সাহসী। কেননা তার কোন পিছুটান থাকেনা বা আপনজন থাকেনা। তখন ওই যোদ্ধা তার জীবনের ঝুঁকি নিতে কম ভয় পায়। আর এই পরিস্থিতিতে আবির্ভূত হন ভ্যালেন্টাইন নামের একজন বিশপ, যিনি প্রেমে বিশ্বাস করতেন, তিনি সৈন্যদের বিয়ে দিয়ে তা উদযাপন করতেন, এভাবে তিনি তৎকালীন সাম্রাজ্যেরে শাসনের আদেশের বেড়াজাল ভেঙ্গে দিয়েছিলেন।

    ভ্যালেন্টাইন নামে আরেক ধার্মিক ব্যক্তিকে ঘিরে ভিন্ন ধরনের গল্প রয়েছে। ওই গল্প অনুযায়ী তিনি রাস্তায় রাস্তায় গোলাপ বিতরণ করতেন।

    আরেকটি গল্প অনুসারে ভ্যালেন্টাইন নামে এক ব্যক্তি কাগজে হৃদয় কেটে সৈন্যদের দিতেন, যাতে তারা সেই কার্ডগুলি দেখে তার প্রিয়জনকে মনে রাখতে পারে।

    এমন গল্পও আছে যেখানে ভ্যালেন্টাইন নামে একজন ধর্মযাজক তার প্রভাবশালী আত্মীয়দের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি প্রেমের প্রকৃত অনুভূতি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

    সেই উপলব্ধি থেকে তিনি একজন খ্রিস্টান তরুণ এবং তার প্যাগান বান্ধবীর মধ্যে মিলনকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে অর্থাৎ তাদের বিয়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন।

    প্যাগানরা মূলত বহু-ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন। যাদের সাথে খ্রিস্টানদের ব্যাপক বিরোধ ছিল।

    আর বাংলাদেশে ভ্যালেন্টাইন ডে পালিত হয় বন্ধুত্ব, আস্থা, ভালোবাসাসহ হৃদয়ের বিভিন্ন ধরনের অনুভূতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে। অবশ্য রাজনৈতিক বিরোধ মিটিয়ে দিতে এই দিন প্রতীতি নেতার ভূমিকায় অভিনয় করে ফুল বিনিময় করা হতো। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে কতটা ভালোবাসা ফিরেছে বোধগম্য নয়।  বলা যায় এভাবেই বাংলাদেশে ভ্যালেন্টাইন ডের যাত্রা শুরু। তবে সবথেকে আনন্দের বিষয় এই দিনটিতে প্রচুর তরুণ তরুণী দল রাস্তায় নেমে আসে হাতে ফুল নিয়ে। এটা হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অন্য রকমের একটা ভালোবাসা বা ভালো লাগার প্রতিচ্ছবি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভালোবাসা দিনটি রঙ্গিন থাকে।

     

    ইতিহাসে ভ্যালেন্টাইন নামে একাধিক সেইন্টের দেখা মেলে তাই নানা মতামত:

    ক্যাথলিক সেইন্টদের রেকর্ড অনুযায়ী, ভ্যালেন্টাইন নামে মোট ১১ জন সেইন্ট আছেন। তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন প্রেমের বার্তা ছড়ানোর জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন।

    সেইন্টদের জীবনী বা হ্যাজিওগ্রাফি গবেষক, ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অফ সাও পাওলো (ইউনিফেস্প) এর গবেষক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হ্যাজিওগ্রাফি সোসাইটির সহযোগী থিয়াগো মায়েরকি এই তথ্য দিয়েছেন।

    তিনি বলেন, “এই তিনটি চরিত্র নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা দেয়, একজনের সাথে আরেকজনকে গুলিয়ে ফেলা হয়”,

    তিনি আরও বলেন, “গির্জা বা চার্চে যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনকে উদযাপন করা হয় তিনি, রোমের সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। তার সাথে একজন ডাক্তারের গল্পও মিলে যায় যিনি পরবর্তীতে একজন ধর্মযাজক হয়েছিলেন এবং সম্রাটের আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে সৈন্যদের বিয়ে দেয়া উদযাপন করেছিলেন। কিন্তু তার আসলেই কোনো অস্তিত্ব ছিল কি না, সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে।”

    যদি একজন ভ্যালেন্টাইনকে আরেকজন ভ্যালেন্টাইন থেকে আলাদা করা কঠিন হয় তবে এটা প্রমাণ করা আরও কঠিন হবে যে সত্যিই কী ঘটেছে। সেইসাথে এই প্রশ্নও ওঠে যে শত শত বছর ধরে চর্চিত এই কিংবদন্তি চরিত্রের আদৌ কোনো অস্তিত্ব ছিল নাকি সবই মনগড়া?

    যেহেতু ১৪ই ফেব্রুয়ারি উদযাপন করা চরিত্রটি নিয়ে ক্যাথলিক ধর্মে এতো বিতর্ক রয়েছে, ফলে বাস্তবতা কী এবং পৌরাণিক কাহিনী কী তা নিশ্চিত করতে না পারায় ক্যাথলিক চার্চ নিজেরাই তাদের প্রথাগত লিটার্জিকাল ক্যালেন্ডার থেকে ১৪ই ফেব্রুয়ারির উৎসবটিকে সরিয়ে দেয়।

    ১৯৬০ সালে দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিলের পরে তা করা হয়। তারপরও সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের সম্মানে কিছু কিছু সম্প্রদায় আজও এই উৎসব উদযাপন করে, যেখানে ঐতিহ্য বেশ শক্তিশালী।

     

    পৌরাণিক কাহিনীর জন্ম যেভাবে:

    চার্চের দাপ্তরিক নথিতে, বেশ সংক্ষেপে এ সংক্রান্ত তথ্য দেয়া আছে। সেই তথ্য থেকে একজন ভ্যালেন্টাইনকে অন্য ভ্যালেন্টাইনের থেকে আলাদা করা যায় না।

    রোমান মার্টায়রোলজি, যেখানে সেইন্টদের জীবনী পাওয়া যায়, সেখানেও এ সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেয়া আছে।

    সেখানে ১৪ই ফেব্রুয়ারি, সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে তিনি “রোমে, ভিলা ফ্ল্যামিনিয়ায়, মিলভিয়ান ব্রিজের পাশে” মারা গিয়েছিলেন। এরচেয়ে বেশি কোনো তথ্য দেয়া হয়নি।

    ব্রাজিলের অ্যাকারাউ ভ্যালির স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও সেইন্টদের জীবনী গবেষক ড. হোসে লুই লিরা বলেন, “দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিলের আগে বিভিন্ন বিশেষ দিন উদযাপনের বিষয়ে যে বই প্রকাশ হয় সেই মিসালেও বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে বলা হয়েছে যে ভ্যালেন্টাইন একজন ধর্মযাজক এবং শহীদ ছিলেন। ২৭০ সালের দিকে তিনি মারা গিয়েছিলেন।”

    তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, ভ্যালেন্টাইনস ডে সম্পর্কে এখন যেসব কল্পনাপ্রসূত ধারণা পাওয়া যায় সেগুলো মূলত সম্পূর্ণ “মৌখিক এবং লিখিত সাহিত্য”।

    তার মতে, যারা প্রথম খ্রিস্ট ধর্মে গ্রহণ করেছিল তাদের নিয়ে নানা গল্প কথা প্রচলিত আছে তাদের মতো এদের নিয়েও নানা গল্পকথা তৈরি হয়েছিল।

    আর এই রীতিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমে আরও শক্তিশালী আসন গেড়ে বসে। যতদিন পর্যন্ত না চার্চ এগুলোকে একটা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।

     

    তবে গল্পের পেছনে আরও গল্প আছে:

    এত দ্বন্দ্বের মধ্যে, আসল ভ্যালেন্টাইনস ডে কী হতে পারে সেই তথ্য বিভিন্ন সূত্র দ্বারা নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। তৃতীয় শতকে রোমে বসবাস করেছেন, আবার সে সময় তৎকালীন সম্রাট ক্লডিয়াসের সরকারের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন এসব তথ্য থেকে ওই প্রেমের সেইন্টকে খুঁজে বের করা সম্ভব।

    সেইন্টদের জীবনী বা মার্টায়রোলজিতে বলা হয়েছে, এই ইতিহাসের সাথে রোমের টাইবার নদীর উপর মিলভিয়ান সেতুর অস্তিত্ব জুড়ে আছে।

    “এই সেতুটি প্রায় ২০৭ সাল থেকে আছে”, লিরা জোর দিয়ে বলেন। “এটি দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের সময়, ব্যাটেল অব মেটাউরোর ফিরে আসা উপলক্ষে নির্মাণ করা হয়েছিল।”

    এটিও বিশ্বাস করা হয় যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন শহীদ হয়েছিলেন, তখনকার যুগে অনেক বিশিষ্ট খ্রিস্টানদের মেরে ফেলার বিষয়টি সাধারণ ছিল। বিশেষ করে রোম সাম্রাজ্যের আদেশ পালন না করলে তাদের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেয়া হতো।

    তার মৃত্যুর তারিখ ১৪ই ফেব্রুয়ারি হওয়ার বিষয়টি সম্ভবত একটু দেরিতে সামনে এসেছে। এখানে চার্চ তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় একটি সুবিধাজনক সময় বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে চতুর্থ শতক থেকে যখন খ্রিস্টান ধর্ম আনুষ্ঠানিক ধর্মে পরিণত হয়, যার লক্ষ্য ছিল নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্যাগানদের আচার অনুষ্ঠানগুলো তুলে দেয়া।

    ভ্যাটিকানবাদী ফিলিপ ডমিঙ্গুয়েস, রোমের পন্টিফিকাল গ্রেগরিয়ান ইউনিভার্সিটির ডাক্তার এবং রোমের লে সেন্টারের ডেপুটি ডিরেক্টর বলেন, “এমনকি খ্রিস্টান ধর্ম এখন আনুষ্ঠানিক রূপ পেলেও, প্রথমে রোমানদের প্যাগান বা পৌত্তলিক রীতিগুলো খ্রিস্টধর্মের সাথে সহাবস্থান করতো সেই সময়ের চার্চ ধীরে ধীরে প্যাগান বা পৌত্তলিক রীতিগুলো দমন করার জন্য নিজেদের কিছু উৎসব, স্মৃতিস্মারক এবং অভ্যাস তৈরি করতে শুরু করে। প্যাগান মন্দিরগুলোকে গির্জায় পরিণত করা হয় এবং আচারগুলোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা শুরু হয় সেই সময় থেকেই।”

    এই কারণে, ৪৯৬ সালে, পোপ গেলাসিয়াস (৪১০ থেকে ৮৯৬ সাল) ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন্স ডে পালন করা উচিত বলে প্রতিষ্ঠা করেন। সিদ্ধান্তটি আকস্মিকভাবে নেয়া হয়নি।

     

    প্যাগানদের উৎসব ও তীর্থস্থান:

    উত্তর গোলার্ধে বসন্ত শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস আগে, প্রাচীন রোমে লুপারক্যালিয়া নামে একটি উৎসব হতো। এটি ছিল মূলত জমির উর্বরতা লাভের আশায় এক ধরনের আচার অনুষ্ঠান।

    ডমিঙ্গুয়েস বলেন, “এটি এমন এক সময় ছিল যখন ধর্মীয় আচার হিসাবে একজন আরেকজনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যৌন সম্পর্কে মিলিত হতো। এর মাধ্যমে ফসল বপনের সময়কেও বোঝাতো এবং তারা এই উপায়ে দেবতাদের আশীর্বাদ চাইতো যাতে প্রচুর ফসল ফলে এবং একটি উর্বর বছর যায়”,

    এজন্য পোপ এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন যা খ্রিস্টান নৈতিকতার সাথে যায়।

    ভ্যাটিকানবাদী ডমিঙ্গুয়েস আরও বলেন, “তিনি ওইসব আচার অনুষ্ঠানের অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন এবং তাই তিনি এই অনুষ্ঠানের একটি খ্রিস্টান পরিচয় তৈরি করেছিলেন। তিনি সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনকে প্রেমিকদের, দম্পতিদের পৃষ্ঠপোষক প্রতিনিধি হিসাবে রাখেন। চার্চ বিদ্যমান অভ্যাসগুলোকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেনি তবে সেগুলোকে সমন্বয় করেছে, যেন প্যাগান আচার এবং সামাজিক রীতিগুলোকে একটি খ্রিস্টান ন্যায্যতা দেওয়া যায়।”

    সেই অর্থে, ভ্যালেন্টাইনকে বেছে নেয়ার বিষয়টি হঠাৎ করে সামনে আসতে পারে বলে ডমিঙ্গুয়েস মনে করছেন।

    তিনি বলেন, “আমরা যতদূর জানি এর পেছনে নির্দিষ্ট কোন কারণ নেই,” তিনি বলেন এবং পরবর্তীতে হয়তো প্রেমের গল্প ভরা কিংবদন্তি চরিত্র তৈরি করা হতে পারে।

    গবেষক মায়েরকি বলেন, “সেই মুহূর্তে ভ্যালেন্টাইন্স ডে এর স্মৃতিটি প্রেমের সাধনা, প্রেমিকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার সাথে যুক্ত হতে শুরু করে।”

    ম্যাকেঞ্জি প্রেসবিটারিয়ান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইতিহাসবিদ ডেনিস ওয়ান্ডারলি পেস ডি ব্যারোস বলেছেন, “চার্চ একটি প্রাচীন ঐতিহ্যকে খ্রিস্টান রূপ দিতে ভ্যালেন্টাইন্স ডে প্রতিষ্ঠা করেছে।”

    আশ্চর্যজনকভাবে, যে উৎসবের আর্বিভাব হয়েছিল প্যাগানদের থেকে তা পরে খ্রিস্টধর্ম তাদের নিজেদের মতো করে উদযাপন করে।

    তবে আজ এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন ভ্যাটিকানবাদী ডমিঙ্গুয়েস। তিনে বলেন, “এখানে খ্রিস্টান সেইন্টের নাম ব্যবহার করা হলেও এটি খ্রিস্টানদের ছুটির দিন নয়।”

    পরে সম্ভবত ভ্যালেন্টাইনের যে জীবনী তৈরি করা হয়েছিল– বা যতো ভ্যালেন্টাইনের কথা হচ্ছে, তাদের গল্পের পুরোটাই হয়তো কল্পকাহিনীতে পূর্ণ।

    দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিল শুরুর সময় থেকে চার্চের একটি প্রচেষ্টা ছিল “সেইসব সেইন্টদের স্মৃতি মুছে ফেলা যারা একটি পৌরাণিক গল্প ছাড়া আর কিছুই ছিল না, এরপরও এক সময় তারা কিংবদন্তি চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন”, ব্যাখ্যা করেন গবেষক মায়েরকি।

    “কাউন্সিল চলাকালীন, নির্দিষ্ট কয়েকজন সেইন্টের অস্তিত্ব নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল”, লিরা জোর জানান।

    “ফলস্বরূপ, কেউ কেউ বাধ্যতামূলক এই উৎসব উদযাপনকে ঐচ্ছিক উৎসবে পরিণত করে। ষষ্ঠ সেন্ট পল (১৮৯৭ থেকে ১৯৭৮ সাল), পোপ, ১৯৬৯ সালে, সেইন্টদের উদযাপনের জন্য ক্যালেন্ডারের সংস্কার করেন এবং তখন থেকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের স্মৃতিচারণ ঐচ্ছিক হয়ে ওঠে।”

    “মার্টায়রোলজিতে একাধিক ভ্যালেন্টাইনের অস্তিত্ব থাকার কারণে এবং তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনো বিবরণ না থাকার কারণে এমনটা হয়।”

    “মারা যাওয়া সেইন্টদের রেকর্ড প্রতিটি চার্চের দায়িত্বে ছিল, তাই এসব তথ্যের সম্পূর্ণ সত্যতা দেওয়া সম্ভব না”, হ্যাজিওলজিস্ট যোগ করেন।

    এর আরও অনেক পরে, নিজেকে একজন খ্রিস্টান সেইন্ট ঘোষণা করার ক্ষেত্রে মানদণ্ড আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়। সহজ করে বললে সেইন্ট উপাধি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

    গবেষক মায়েরকির মতে “ভ্যালেন্টাইনস ডে বলে কিছু ছিল না এটা বলা খুবই কঠিন” এর একমাত্র কারণ “আমার অন্তত মনে আছে, এই দিনটির অস্তিত্ব ছিল এবং আছে। যেহেতু চার্চের বিভিন্ন দল লম্বা সময় ধরে দিনটি উদযাপন করে আসছে।”

    গবেষক পায়েস ডি বারোস বলেন, “ক্যাথলিক চার্চ মনে করেছিল যে তাদের সকলের (ভ্যালেন্টাইনদের) ঐতিহাসিক গুরুত্বের অভাব ছিল।

    বিভিন্ন নথিপত্র এবং প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করার সময় দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় সমাহিত ভ্যালেন্টাইন নামের সেইন্টদের তথ্যে ঐতিহাসিক অসঙ্গতি আছে।

    সেইন্টদের সমাধিগুলো যদি ধর্মীয় তীর্থস্থান কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে ভ্যালেন্টাইন্স ডে’কে ঘিরে ইতালিতে অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে।

    রোমের কসমেডিনে ব্যাসিলিকা অব সান্তা মারিয়ায় রিলিকোয়ারি নামক বাক্সে একজন মানুষের খুলি রাখা আছে। বলা হয় এটি সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের খুলি।

    বাকি দেহাবশেষ টারনি শহরের সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ব্যাসিলিকায় পাওয়া যায়।

    সেন্ট ভ্যালেন্টাইন একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি হয়ে ওঠার আগে উমব্রিয়ার ইন্টারামনার বিশপ ছিলেন যে শহরটি এখন টারনি নামে পরিচিত।

    এছাড়া ইতালিতে, পাদুয়া প্রদেশের মনসেলিসে সেন্ট জর্জের চার্চে, অন্য এক ভ্যালেন্টাইনের সমাধি রয়েছে।

    সেইন্ট এবং অন্যান্য প্রাচীন ব্যক্তিত্বদের ফেসিয়াল রিকন্সট্রাকশন বা মুখের পুনর্গঠনের বিশেষজ্ঞ ও ব্রাজিলিয়ান ডিজাইনার সিসেরো মোরেস ওই সংরক্ষিত মাথার খুলির অবয়ব থেকে থ্রিডিতে উভয় ভ্যালেন্টাইনের সম্ভাব্য ছবি প্রকাশ করেছেন।

    তবে যাই হোকনা কেন ব্যালেন্টাইন ডে সম্পর্কে একটা বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।  এই বিতর্কের মধ্যে থেকেও বিশ্বের প্রতিটি মানুষ ভালোবাসা প্রকাজের বিষয়টি বশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। তবে এই ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালাবাসা দিবসে অনেক দেশেই যুদ্ধ চলছে। কেউ অস্ত্র নিয়ে ছুটছে কেউবা ফুল নিয়ে ভালোবাসার প্রতিক্ষায় আছে। তবে ফুল নিয়ে যারা ঘোরাঘুরি করছে তাদের সংখ্যই বেশি।

    সূত্র: বিবিসি বাংলা

  • ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’কে ভারতের নিজস্ব পণ্য হিসেবে দাবি করা হচ্ছে

    ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’কে ভারতের নিজস্ব পণ্য হিসেবে দাবি করা হচ্ছে

    www.HelloBangla.News – মতামত – ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪: ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বলতে আমরা সাধারণত সেই সব পণ্যকে বলে থাকি যা সেই দেশের সংস্কৃতি, পরিবেশ, মোটিফ, এলাকায় উৎপক্তি পরিচিতি এবং প্রসারের বিত্তে আবদ্ধ থকে।

    আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) নিয়ম মেনে বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেটেন্টস, ডিজাইন এবং ট্রেডমার্ক বিভাগ (ডিপিডিটি) এই স্বীকৃতি ও সনদ দিয়ে থাকে। যে ব্যক্তি/ প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা জি-আই এর জন্য আবেদন করেন সেটার মেধাস্বত্ত্ব তাদের দেয়া হয়।

    ২০১৩ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন হয়। ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরির পর জি-আই পণ্যের নিবন্ধন নিতে আহ্বান জানায় ডিপিডিটি। এর পর থেকে ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য নির্বাচন করা হয়। জানা গেছে বাংলাদেশের ১৭ টি ভৌগলিক নির্দেশক (জি-আই) পণ্য রয়েছে।

    কিন্তু সম্প্রতি ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ বাংলাদেশের একটি জেলার দীঘদিন ধরে উৎপাদন হচ্ছে এবং সেই জেলার নামানুসারে শাড়িটির নামকরণ হওয়া সত্বেও ভারত দাবি করছে “টাঙ্গাইল শাড়ি’ তাদের নিজম্ব পণ্য। ভারত সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেইজে একটি পোস্টে টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, এটি এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বহিঃপ্রকাশ।

    ওই পোস্টের নিচে অনেক বাংলাদেশি ব্যবহারকারীকে প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়। তাদের বক্তব্য টাঙ্গাইল বাংলাদেশের একটি জেলার নাম এবং ওই শাড়িটির উৎপত্তি এই জেলায়। কিন্তু এই বিতর্কের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে আরো এক মাস আগে। চলতি বছরের জানুয়ারির দুই তারিখে টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক নির্দেশকপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

    ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেড মার্কস বিভাগের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সুন্দরবনের মধুও এই রাজ্যটির নিজস্ব পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন রেজিস্ট্রি’র তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হস্তশিল্প বিভাগ এর জন্য আবেদন করেছিলো ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে।

    টাঙ্গাইল শাড়িকে ধরা হয় নদীয়া ও পূর্ববর্ধমানের পণ্য হিসেবে। একইসাথে মুর্শিদাবাদের গরদ ও করিয়াল নামে আরো দুটি শাড়িও যুক্ত হয় জিআই নিবন্ধিত তালিকায়।

    বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য জিআই’র তালিকায় টাঙ্গাইল শাড়ির উপস্থিতির কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

     

    টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তিস্থল:

    বিভিন্ন গবেষণা এবং এই শিল্পের আদি ধারার সাথে সম্পৃক্তদের বয়ানে এই শাড়ির উৎপত্তিস্থল হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে উঠে আসছে পাথরাইল, নলশোধা, ঘারিন্দাসহ টাঙ্গাইলের এমন বাইশ-তেইশটি গ্রামের নাম।

    বলছিলেন হরিপদ বসাক, যিনি ওই তাঁতীদের বংশধর। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ‘পূর্ব বাংলায়’ হলেও বর্তমানে বসবাস করছেন পশ্চিম বঙ্গের নদীয়ায়। তিনে বলেন, “একসাথে বাইশগ্রাম বলে চিহ্নিত করা হতো। এসব গ্রামই ঠিকানা ছিলো তাঁতীদের। যাদের পদবি ছিল ‘বসাক’।”

    উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের ব্রিটিশ ভারতে টাঙ্গাইল ছিল ময়মনসিংহ জেলার এক মহকুমা।

    মি. হরিপদ বসাক জানান, “১৮৫০ সাল বা তার কাছাকাছি সময়ে তৎকালীন ধামরাই এবং চৌহট্ট নামে দুটি গ্রামে মসলিনের উত্তরসূরী কিছু তাঁতি বসবাস করতেন। সন্তোষ, করটিয়া, দেলদুয়ারে জমিদারি পত্তনের সময় অন্যান্য পেশাজীবীদের পাশাপাশি ওই তাঁতিদেরও সেসব জায়গায় নিয়ে বসতি স্থাপন করা হয়।”

    এসব গ্রামের মানুষেরা যে শাড়ি বয়ন করতেন তাই ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

     

    নদীয়া বা পূর্ব বর্ধমানে প্রচলন যেভাবে:

    ২০১৪ সালে টাঙ্গাইল জেলার তাঁতীদের নিয়ে একটি গবেষণা করেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষক সুব্রত ব্যানার্জি, মো. মনিরুজ্জামান মুজিব ও সুমনা শারমিন।

    গবেষণায় দেখা যায়, পাকিস্তান পর্বে তো বটেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরেও বসাক সম্প্রদায়ের পরিবারের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পেতে। নলশোধা গ্রামের উদাহরণ টেনে উল্লেখ করা হয়, স্বাধীনতার পর পুরো গ্রামেই বাড়িতে বাড়িতে তাঁত থাকলেও ২০১৪ সালে সরেজমিনে তারা দেখতে পান মাত্র ২২ টি পরিবার এই পেশায় যুক্ত আছে।

    বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁতশিল্প নিয়ে গবেষণা করেন নিলয় কুমার বসাক। তিনিও ওই তন্তুবায় সম্প্রদায়ের উত্তর প্রজন্ম।

    মি. নিলয় বলেন, “১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বসাক সম্প্রদায়ের বড় অংশই ভারতে চলে যান। তাদের ভিড়টা বেশি হয় নদীয়া জেলার ফুলিয়া গ্রাম এবং পূর্ব বর্ধমানের ধাত্রী গ্রাম ও সমুদ্রগড়ে।”

    তাদের বদৌলতে নদীয়া ও পূর্ব-বর্ধমানে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ পরিচিতি লাভ করে, যোগ করেন তিনি। হরিপদ বসাকও প্রায় একই রকম তথ্য দিলেন। সঙ্গে যুক্ত করলেন, “এই বিদ্যেটা জানা ছিলো বলে আমাদের উদ্বাস্তু জীবনের বোঝা বইতে হয়নি।”

     

    জিআই’র সম্পর্ক স্থানের সঙ্গে না ব্যক্তির সঙ্গে:

    ২০১১ সালেও একবার টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য জি আই আবেদন করা হয়েছিল বলে জানান মি. বসাক। বলেন, “সেই আবেদনটি বাতিল হয়ে গিয়েছিল।”

    তারপরও চেষ্টা চালিয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ফল পেয়েছে ২০২৪ সালে এসে।

    কিন্তু, প্রশ্ন উঠছে উৎপত্তিস্থল টাঙ্গাইলের নাম ধারণ করার পরও ভৌগলিকভাবে অন্য স্থানের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না?

    এর জবাবে, হরিপদ বসাক সামনে নিয়ে আসছেন পশ্চিমবঙ্গেরই বালুচরী শাড়ির উদাহরণকে।

    তার ভাষ্য, “অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে মুর্শিদাবাদ জেলার বালুচর নামক স্থানে এই শাড়ির জন্ম হলেও পরবর্তীকালে বন্যার কারণে বালুচরী তাঁতিরা বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে চলে আসেন। পরবর্তীতে সেখানে এই শাড়ির প্রসার ঘটে।”

    “স্থানান্তরিত হলেও বালুচরী শাড়ি ‘বিষ্ণুপুরি’ বা অন্য কোনও নাম পরিগ্রহ করেনি, বরং বালুচরী নামেই জিআই পেয়েছে।” বলেন এই তাঁতশিল্প গবেষক।

    আর নিলয় বসাক উল্লেখ করেছেন, “দেশভাগের বলি হয়ে ভারতে চলে এলেও ‘টাঙ্গাইল’ শব্দটি ছিল বসাক তাঁতিদের অস্থিমজ্জাগত। ফলে উদ্বাস্তু এই তাঁতিরা নিজেদের বয়নীকৃত শাড়ির নাম বা বয়ন কৌশল পরিবর্তন করার কথা কল্পনাও করেননি।”

    কিন্তু এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেন বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন, বিসিক এর বিপণন শাখার মহাব্যবস্থাপক অখিল রঞ্জন তরফদার।

    ঢাকাই জামদানি, রংপুরের শতরঞ্জি ও শীতলপাটির মত পণ্যগুলোর জিআই প্রাপ্তির সময় এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মি. অখিল রঞ্জন।

    তিনি বলেন, “এটা যৌক্তিক নয়। এটার নামই কিন্তু জিওগ্রাফিক্যাল, অর্থাৎ, ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এই পণ্যটার একটা স্বীকৃতি। এখানে ব্যক্তির কোনো বিষয় নেই। যারা আগে চলে গেছে, তারা এমন দাবি করে করলে এটা একটু খটকাই লাগে,” ।

    তিনি এ খবরে ‘বিস্মিত’ হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন।

    তিনি বলেন, “শাড়িটার যেহেতু টাঙ্গাইলেই উৎপত্তিস্থল, এখানেই উৎকর্ষ। এই স্থানের ভিত্তিতেই কিন্তু এটার স্বীকৃতি হওয়া উচিত।”

    মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালেয়ের গবেষকদের সুব্রত ব্যানার্জি ও সুমনা শারমিনও এই ধারণাটাকেই সমর্থন করেন।

    অবশ্য, নিলয় কুমার ও হরিপদ বসাকও এ বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকে যায় বলে মনে করেন।

     

    দুই দেশের শাড়ির বৈশিষ্ট্যে কী:

    তাঁত শিল্পী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা যাচ্ছে, টাঙ্গাইলের শাড়ির সুতা মিহি ও চিকন হয়। সুতা টেকসই হয়, ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহার নৈমিত্তিক ব্যবহারের উপযোগী থাকে। এ ধরনের শাড়ি তপ্ত আবহাওয়ায়ও আরামদায়ক হয়।

    তাঁতিদের স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শাড়িতেও বিভিন্ন পরিবর্তন যুক্ত হয়েছে বলে জানালেন মি. হরিপদ বসাক।

    তিনি বলছেন, “টাঙ্গাইল ঘরানার ওপর কাজ করে এটাতে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কালার বা ডিজাইনে ঘটানো হয়েছে পরিবর্তন।”

    ব্যবসায়ীরা জানয়েছেন, বাংলাদেশের বাজার ভারতের শাড়িতে সয়লাব । ভারত থেকে যেসব ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ আসে সেগুলো একটু ‘সিল্ক টাইপের’ হয় ।

     

    টাঙ্গাইলে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’র হালহকিকত:

    বসাকদের বাইরেও অনেকেই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন দীর্ঘদিন ধরে। তেমনই এক তাঁতবস্ত্র ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান নাজমুল হাসান। আগে বল্লারামপুর গ্রামে নিজেদের তাঁত থাকলেও করোনা মহামারীর অভিঘাত পার করে এখন আর সরাসরি উৎপাদন না করে বিপণনের সঙ্গে যুক্ত আছেন।

    মি. নাজমুল বলেন, “আমার ছোটবেলায় দেখছি রমরমা বিজনেস ছিল। এখন সেই বিজনেসটা আর নাই।

    হাতের তাঁতগুলো উঠে গিয়ে এই শিল্প পাওয়ার লুমের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে দাবি করেন, মেশিনেও কাপড়ের মান মোটামুটি একইরকম থাকে।

    তিনি বলেন, “করোনার পর এই অঞ্চলের অর্ধেক তাঁত নাই হয়ে গেছে। আমাদের ৫০ টা তাঁত ছিলো। ২০-৩০ লাখ টাকা লস দিয়ে হলেও সেগুলো একেবারে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি।”

    এখন মি. নাজমুল অন্যান্য উৎপাদকদের কাছ থেকে কিনে শো-রুম ও অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করেন।

    পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া বা বর্ধমানেও হ্যান্ডলুমের জায়গা দখল করে নিয়েছে পাওয়ার লুম। ফলে, জি আই স্বীকৃতি মিললেও হস্তচালিত তাঁতে বোন টাঙ্গাইল শাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে সেখানকার বসাকদেরও।

     

    বাংলাদেশের যেসব পণ্য জিআই তালিকায়:

    বাংলাদেশের মোট জিআই পণ্যের সংখ্যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ টিতে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে নিবন্ধিত জি-আই পণ্য হল – নাটোরের কাঁচা গোল্লা।

    বাংলাদেশের শীতলপাটি, রাজশাহী সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, কালিজিরা চাল, দিনাজপুরের কাটারীভোগ চাল এবং নেত্রকোনার সাদামাটি ২০১৭ ও ’১৮ সালে এই তালিকায় স্থান পায়।

    আরও স্থান পায় বাগদা চিংড়ি, বগুড়ার দই, শেরপুরের তুলশিমালা ধানা, চাপাই নবাবগঞ্জের ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আম।

    এর আগে, বাংলাদেশে প্রথম বারের মতো জি-আই পণ্য হিসাবে ২০১৬ সালে স্বীকৃতি পেয়েছিল জামদানি। এরপর ২০১৭ সালে ইলিশ, ২০১৯ সালে খিরসাপাতি আম, ২০২০ সালে ঢাকাই মসলিনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

    এরপর থেকে এই পণ্যগুলো বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসাবে বিশ্বে পরিচিতি পাচ্ছে। কোনো একটি দেশের পরিবেশ, আবহাওয়া ও সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখে, তাহলে সেটিকে ওই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

    কোন পণ্য জি-আই স্বীকৃতি পেলে পণ্যগুলো বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং করা সহজ হয়। এই পণ্যগুলোর আলাদা কদর থাকে। ওই অঞ্চল বাণিজ্যিকভাবে পণ্যটি উৎপাদন করার অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা পায়।

    ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ ভারতের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিষ্ময় বলে মনে হচ্ছে।

    সূত্র: বিবিসি

  • বলিউড তারকাদের মানসিক অবসাদ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে মতামত

    বলিউড তারকাদের মানসিক অবসাদ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে মতামত

    www.HelloBangla.News – মতামত – ১৩ জানুয়ারি, ২০২৪: বলিউড অভিনেত্রী দীপিকা পাডুকোন কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, “মা সবার আগে বুঝতে পারেন এই কান্নাটা অন্যরকম।”

    কেননা তিনি চরম একটা মানসিক অবসাদে ছিলেন। সবকিছুই অর্থহীন মনে হচ্ছিল। শারীরিক বা মানসিকভাবে কিছুই যেন অনুভব করতে পারছিলাম না। ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। আর এই কান্নাটার অর্থ উলব্দি করতে পারেন মা। তারপর সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিয়েছিলেন এই অভিনেত্রী।

    শুধু দীপিকা নয় বলিউডের অনেক তারাকা আছেন যারা মানসিক অবসাদে ভুগে থাকেন এবং এক পর্যায়ে আত্মহত্যার পথ খুজে নেন। এদের মধ্যে অন্যতম সুশান্ত সিংহ রাজপুত,  জিয়া খান, শ্রীদেবী, দিব্যা ভারতী, পারভিন ববি, সিল্ক স্মিতা, গুরু দত্ত, নাসিফা জোসেফ, অর্চনা পাণ্ডে, কুলজিৎ রণধাওয়া, বিবেকা বাবাজি, কুনাল সিংহ, মনমোহন দেশাই সহ আরও অনেকে। অনেক তারকা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছিড়ে ধর্মিয় উপাসনার পথ বেছে নিয়েছেন।

    এদের মধ্যে সুশান্ত সিংহ রাজপুত,  জিয়া খান ছিলেন সম্ভাবনাময়। শ্রীদেবী অভিনয় জগতের সোনালী অধ্যায় পেরিয়ে এসে অনেক বয়সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। বিষয়গুলো কেন হচ্ছে। এটা নিয়ে মতামত দিয়েছেন অনেকে।

     

    সম্প্রতি আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে আলোচনার বিষয় ছিল, ‘আধ্যাত্মিকতা আর জীবন’। বিশেষ অতিথি ছিলেন অস্কার জয়ী সঙ্গীতকার এআর রহমান। ছেলেবেলায় সম্মুখীন হওয়া লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন এক সময় তিনি নিজেকে শেষ করে দিতে ছেয়েছিলেন।

    অক্সফোর্ড ইউনিয়ন ডিবেটিং সোসাইটির ওই অনুষ্ঠানে পডুয়াদের সঙ্গে ‘আধ্যাত্মিকতা এবং জীবন’ নিয়ে কথোপকথনের সময় তিনি জানিয়েছেন, মায়ের বলা কয়েকটা কথা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার চিন্তার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে তাকে শক্তি জুগিয়েছিল। রসদ দিয়েছিল বেঁচে থাকার।

    এআর রহমান একা নন, মানসিক অবসাদ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে নিজেদের লড়াইয়ের কথা বলতে শোনা গিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তারকারাদের।

    এই তালিকায় রয়েছেন অভিনেতা ডোয়েন জনসন এবং লেডি গাগা, বিয়ান্সে, অ্যাডেল-এর মতো গায়িকারা, হ্যানামন্টানা খ্যাত মাইলি সাইরাস-সহ অনেক হলিউড তারকারাই। রয়েছেন, বলিউডের একাধিক সেলেব্রেটিও।

     

    যে সময়টাতে আত্মহত্যার চিন্তা আসত

    চরাই উতরাইয়ের কথা বলতে গিয়ে খ্যাতির শীর্ষে দাঁড়িয়ে থাকা এআর রহমান যে হতাশা, অবসাদ বা আত্মহত্যার চিন্তা কথা অকপটে বলবেন তা হয়তো আশা করেননি অনুষ্ঠানে উপস্থিত কেউই।

    বাবাকে অল্প বয়সে হারানোর পর তাকে আর তার পরিবারকে আর্থিক সমস্যা-সহ একাধিক বাধা বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

    ছোটবেলা থেকে চলে আসা নিজের লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে এআর রহমান বলেন, “যে সময়ে আমার আত্মহত্যার কথা মনে হতো… যে সময়ে আমার বয়স কম। তখন মা বলতেন-যদি তুমি অন্যের জন্য বাঁচো, তাহলে এই সব চিন্তা আর মাথায় আসবে না। এটা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আমার জীবনের অন্যতম সবচেয়ে সেরা উপদেশ।”

    অক্সফোর্ড শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ এআর রহমানকে প্রশ্ন করেছিল আধ্যাত্মিক বিষয়ে। সে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জীবনযুদ্ধের আরও একটা পাতা উল্টে দেখেন তিনি।

    মি. রহমান বলেন, “আমরা সবাই অন্ধকার সময়ের মধ্যে দিয়ে যাই। আমরা এই পৃথিবীতে ছোট সফরে এসেছি এবং এটাই একটা ধ্রুব সত্য। আমরা জন্মেছি, আমরা চলেও যাব। এটা আমাদের স্থায়ী জায়গা নয়।”

     

     

    মানসিক অবসাদ নিয়ে কথা বলেছেন যারা:

    বলিউড অভিনেত্রী দীপিকা পাডুকোন বছর খানেক আগে মানসিক অবসাদ নিয়ে প্রথমবার কথা বলেছিলেন।

    একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এটা শুরু হয়েছিল। একদিন সকালে উঠে পেটে অদ্ভুৎ অনুভূতি হচ্ছিল। এমন একটা অনুভূতি যা আগে কখনও হয়নি। এরপর বেশ কয়েকদিন ভেতরটা শূন্য মনে হচ্ছিল, দিশাহীন, কোনও লক্ষ্য নেই।”

    “সবকিছুই অর্থহীন যেন। শারীরিক বা মানসিকভাবে কিছুই যেন অনুভব করতে পারছিলাম না। ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। যার এই অনুভূতি হয়নি তাকে বুঝিয়ে বলাটা কঠিন পুরো বিষয়টা,” বলেছিলেন মিজ পাডুকোনে। অভিনেত্রীর মা প্রথমে লক্ষ্য করেন বিষয়টা।

    “মা সবার আগে বুঝতে পারেন এই কান্নাটা অন্যরকম। এটা কিন্তু কাজ বা প্রেমিক সংক্রান্ত বিষয় নয়। মা ক্রমাগত জিজ্ঞাসা করতে থাকেন আমায়। আমি কোনও নির্দিষ্ট কারণ বলতে পারিনি। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়ার কথা বলেন তিনি,” মিজ পাডুকোনে বলেছিলেন।

    তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও ছিল। তিনি বলেন, “এক এক সময় আত্মহত্যার কথাও মাথায় আসতো।”

    এছাড়াও ম্রুণাল ঠাকুর, আমিত সাধের মতো একাধিক তারকারাও আত্মহত্যার প্রবণতার কথা জানিয়েছেন।

    অন্যদিকে, অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খানের মতো একাধিক বিখ্যাত বলিউড তারকারা তাদের জীবনযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে হতাশা, অবসাদের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

    তার সংস্থা এবিসিএল-এর ভরাডুবির পর আর্থিকভাবে অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সে সময়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তবে হাল ছেড়ে দেননি। আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন।

    বলিউডের বাদশাহ হিসেবে পরিচিত শাহরুখ খানও হতাশার সম্মুখীন হন। কাঁধে চোট লাগার পর আগের মত পারফর্মেন্স করতে পারবেন কি না এই আশঙ্কা তাকে গ্রাস করেছিল।

    অবসাদের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছিল শাহরুখ খানকেও। তিনিও কিন্তু শারীরিক ও মানসিক বল জুটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ান।

    তবে সবার ক্ষেত্রে তা হয়নি। আত্মহত্যার কারণে একাধিক প্রতিভাময় তারকাকে হারিয়েছে বলিউড।

    অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর বলিউডের অনেকেই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন।

    কিন্তু কেন এই অবসাদ, আর কেনই বা তারকাদের মধ্যে দেখা যায় আত্মহত্যার প্রবণতা?

     

    কেন মানসিক অবসাদ:

    বলিউড বা বিনোদন জগতের তারকাদের অবসাদের বা অন্যান্য মানসিক রোগের সঙ্গে লড়াই নতুন নয়। পারভীন বাবির মতো অনেকেই এর সঙ্গে লড়াই করেছেন।

    সাইকিয়াট্রিস্ট এবং কলকাতা ন্যাশানাল মেডিক্যাল কলেজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. শর্মিলা সরকার বলেন, “প্রত্যেকটা জীবিকাতেই একটা লড়াই থাকে। তারকাদের ক্ষেত্রে এটা হয়তো একটু বেশি।”

    “অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক বা বিনোদন দুনিয়ায় যারা আছেন, তাদের প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। চরাই উতরাই অনেকটা বেশি থাকায় বিনোদন জগতে অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশনের সমস্যাও বেশি দেখা যায়,” বলেন মিস্ সরকার।

    তার কথায়, “অনেকেই অনেক স্বপ্ন দেখেন কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজনই খ্যাতি পান। বাকিরা সাফল্য পান না বা লাইম লাইটে পৌঁছানোর আগেই ফিরে আসতে হয়। অথবা নতুন মুখ এলে পুরানোদের জায়গা ছেড়ে দিতে হচ্ছে- এমন উদাহরণও বিস্তর রয়েছে। এটা অনেকেই মেনে নিতে পারেন না।”

     

    ‘তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নেই ’

    আরজি কর হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ড. রাজর্ষি নিয়োগী বলেন, “যদি ধরে নিই জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশের মানসিক অবসাদ রয়েছে, তাহলে ১০০ জন তারকার মধ্যে পাঁচ জনের ডিপ্রেশন থাকবে। কিন্তু তাদের বিষয়টা আরও কঠিন।”

    বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ডিপ্রেশনের ডিটারমিনেন্টের মধ্যে (যে যে কারণে অবসাদ হতে পারে), সোশ্যাল ডিটারমিনেন্ট (সামাজিক মাপকাঠি), তাদের জীবন শৈলী, তাদের লড়াই, তাদের প্রতিযোগী সুলভ মনোভাব ইত্যাদি রয়েছে।

    “প্রতিনিয়ত তাদের প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু থাকে না। তারা চায়ের দোকানে গিয়ে চা খেতে পারেন না বা মন খুলে আড্ডা দিতে পারেন না, এই ভয়ে যে সাধারণ মানুষ কী বলবে, যদি গণমাধ্যমে তার ব্যক্তিগত জীবন ফাঁস হয়ে যায়। তারা মন খুলে বাঁচতেও পারেন না।”

    এছাড়াও মাদক সেবন বা অন্য নেশার কথাও উল্লেখ করেন ড. নিয়োগী।

    তার কথায়, “তারকাদের অর্থ আছে একই সঙ্গে মাদকও তারা সহজেই পেতে পারেন। এটা কিন্তু একটা বড় সমস্যা। দু’একজন উঠতি গায়ক গায়িকাদের মুখে শুনেছি মাদক সেবন না করলে নাকি গানই করা যায়না! মাদক সেবন কিন্তু মানসিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। হয়তো ভাবে মাদক সেবন করলে ভাল লাগবে, তারপর সেটা আর মজার বিষয় থাকে না। নেশার পর্যায় চলে যায়।”

     

    টিকে থাকার লড়াই সহজ নয়:

    বিনোদন জগতে বিশেষত বলিউডে টিকে থাকার লড়াইটা সহজ নয়। বিশেষজ্ঞরাও জানিয়েছেন একই কথা।

    ড. শর্মিলা সরকার বলেন, কর্মজীবনে শুরুর দিকে লড়াইটা হয়তো বেশি থাকে। কিন্তু কষ্ট করে শক্ত মাটি তৈরি করার পর যদি তাকে ফিরে আসতে হয় তাহলে সেটা মেনে নেওয়া বেশ কঠিন। তখন মনের মধ্যে ঝড় চলতে থাকে। পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবদের তার প্রতি উচ্চাশা থাকে।

    “এই অবস্থায় ফিরে আসাটা খুব মুশকিল। অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি তারা মনে করেছে, -‘এত কষ্ট করে এসেছি, কী মুখে ফিরব। এর থেকে নিজেকে শেষ করে দেওয়া বোধ হয় সহজ।’ শুধু মানসিক অবসাদ নয়, ইম্পালসিভ হয়েও অনেকে এই চরমতম পদক্ষেপ নিয়েছেন এমনটাও আমরা দেখেছি। এই জগতে থাকতে গেলে ধৈর্য ধরাটা খুব দরকার।”

     

    সমস্যার কথা বলাটা কঠিন:

    বিশেষজ্ঞদের মতে তারকাদের অনেকেই সাহায্য চাইতে দ্বিধা বোধ করেন।

    “আমি দেখেছি, মুম্বাইয়ের তারকারা তাদের বাড়িতে বসে মনোবিদদের সঙ্গে কথা বলতে বেশি আগ্রহী। কিন্তু সাইকিয়াট্রিস্টের বা সাইকোলজিস্টের অফিসে কাউন্সিলিং সবচাইতে ভাল হয়। কিন্তু তারকারা চাইছেন তার বাড়িতে বসে কথা বলতে যাতে পাঁচকান না হয়। এবং সাইকোলোজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্ট চুপিচুপি তার বাড়িতে যাচ্ছেন কাউন্সেলিং করতে,” বলেছেন ড. নিয়োগী।

    গোপনীয়তার কথা ভেবে কেউ কেউ অবশ্য টেলিফোন মারফত বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী।

    তবে মাধ্যম যাই হোক, অবসাদের ক্ষেত্রে কথা বলাটা, বিশেশজ্ঞের সাহায্য চাওয়াটা প্রয়োজন সে বিষয়ে জোর দিয়েছেন তিনি। একই কথা বলেছেন, ড সরকার।

    প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর সৌভিক মণ্ডল এ বিষয়ে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরেছেন।

    তিনি বলেন, অনেক সেলেব্রিটিরাই সমাজ মাধ্যমে বা সংবাদমাধ্যমের কাছে এই বিষয়ে কথা বলছেন, এটা প্রমাণ করে তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার বিষয়ে ট্যাবুটা একটু হলেও কমেছে। যেমন দীপিকা পাডুকোন খুব সাবলীল ভাবেই তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন।

    মানসিক অবসাদ বা আত্মহত্যার প্রবণতার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সামাজিক অবস্থানের কথাও বলেছেন অধ্যাপক মণ্ডল।

    উদাহরণ স্বরূপ তিনি বলেন, “হয়তো এটার মধ্যে একটা ক্লাস ডায়নামিক্স আছে।”একই সঙ্গে তিনি লিঙ্গ-ভিত্তিক দিকের কথারও উল্লেখ করেন তিনি।

    “একজন নারীর পক্ষে তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা একজন পুরুষের চাইতে কথা বলাটা কতটা সহজ বা কঠিন এটা কিন্তু দেখার বিষয়। সমাজে অন্য যে ধরনের স্টিরিওটাইপ বা ট্যাবু আছে, এক্ষেত্রেও কিন্তু সেটা প্রযোজ্য।”

     

    সাহায্যের হাত:

    মনোবিদদের পাশাপাশি বাবা-মা, পরিবার এবং পরিচিতদের সান্নিধ্য এবং সাহায্যের হাত যে মানসিক অবসাদের সঙ্গে লড়াইকে কিছুটা হলেও সহজ করে দেয় সে বিষয়ে জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

    এআর রহমান বা দীপিকা পাডুকোন নিজেদের লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়েও একই কথা বলেছেন।

    সে বিষয়ে ড সরকার বলেছেন, বাবা-মায়ের ভুমিকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। লেখাপড়ার ছাড়াও যদি জীবনে কেউ যদি অন্য পথ বেছে নিয়ে এগিয়ে যেতে চান, তাহলেও বাবা-মায়ের উচিৎ পাশে থাকা। তারা যদি সন্তানকে এটুকু বুঝিয়ে বলতে পারেন, যাই হোক আমরা পাশে আছি, তা হলেই সমস্যা অনেকটা কমে যায়।

     

    তবে মানসিক অবসাদে ভুগলে প্রথমে বিষয়টি নিয়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সঙ্গে আলোচান করা উচিত তা না হলে সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিতে হবে। তাছাড়া গানশোনা, পড়া, সিনেমা দেখা ও ভ্রমণ করলেও মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

     

    সূত্র : বিবিসি বাংলা