Tag: টম ক্রুজ

  • বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেয়া সুপারস্টার – টম ক্রুজ

    বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেয়া সুপারস্টার – টম ক্রুজ

    বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী পারিশ্রমিক নেয়া সুপারস্টার অভিনেতা হচ্ছেন টম ক্রুজ। ১০০ মিলিয়ন ডলার নিয়েছেন তিনি টপ গানঃ মেভেরিক চলচ্চিত্রের জন্য। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না তাঁর অতীত জীবন কেমন ছিলো? টম ক্রুজ ৩ জুলাই, ১৯৬২ সালে নিউইয়র্কের সিরাকিউসে দারিদ্র-পীড়িত এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারে চার সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় ছিলেন। তার বাবা ছিলেন ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার থমাস ক্রুজ মেফেয়ার এবং মা ছিলেন বিশেষ শিক্ষার শিক্ষিকা মেরী লি। থমাস ক্রুজ মেফেয়ার একজন বদমেজাজী স্বভাবের লোক হওয়ায় প্রায়শই বিনা কারনে তার সন্তানদের মারধর করতেন। তাঁর বাবা পরিবারের জন্য যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করতে না পারায় কানাডা চলে যায়। এজন্য ৮ বছর বয়সে, টম তার মায়ের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসতে হয়। দারিদ্রতার কারনে সংসার চালাতে তাঁর মায়ের কষ্ট হওয়ায় টম স্কুল শেষে ৩ টি কাজ করতেন। যেমন- ঘাস কাটা, পেপার বিলি করা এবং গ্রিটিংস কার্ড বিক্রি করা শুরু করে। নিউ ইয়র্ক ও কানাডায় ক্রমাগত যাওয়া আসা করার কারণে প্রতি বছর স্কুল পরিবর্তন করতে হতো এবং অবশেষে সিনসিনাটির ফ্রান্সিসকান সেমিনারিতে অধ্যয়নের জন্য একটি গির্জার বৃত্তি পান। অনেক কম মানুষই জানেন ছোট থাকতে টম স্কুলে ছাত্রদের বুলিং এর শিকার হতো কারন সে ডিস্লেক্সিয়া নামক এক অসুখে ভুগছিলেন। সেজন্য পড়তে এবং লিখতে খুব সমস্যা হতো এবং অনেক সময় তাঁর মা স্কুলের লেখা করে দিতেন। পরীক্ষার প্রশ্ন দেখলেও টম এতোটাই ঘাবড়ে যেতো যে প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই খাতা জমা দিয়ে দিতেন। অতঃপর অনেক বছর থেরাপি নেয়ার মাধ্যমে সে ডিস্লেক্সিয়া সমস্যা থেকে বের হতে সক্ষম হয়। তাঁর স্কুল জীবনের এই ঘটনা পরবর্তী সময়ে অনেক ডিস্লেক্সিয়া আক্রান্ত বাচ্চাদের জন্য মোটিভেশন হিসেবে কাজ করে।

    টম নিজেও জানতেন না যে একদিন অভিনয় শিল্পী হবেন। স্কুলে একটি নাটকে অংশগ্রহণ করার পর টম ক্রুজের বেশ ভালো লেগেছিলো। এবং সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে তিনি বড় হয়ে অভিনয়শিল্পী হবেন। ১৮ বছর বয়সে টম একদিন, কোনো প্ল্যান বা জব ছাড়াই বাড়ি ছেড়ে একাকী নিউইয়র্কে চলে যান। তখন দেড় বছর পর্যন্ত টম বিভিন্ন জায়গায় অডিশন দেয়ার পরেও বারবার প্রত্যাখ্যান হচ্ছিলেন। নিজেকে শহরে টিকিয়ে রাখার জন্য, টম ক্রুজ ওয়েটারের কাজ করাও শুরু করেছিলেন।

    ১৯৮১ সালে টম ক্রুজ “এন্ডলেস লাভ” নামে ফিল্মে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেন এবং এখান থেকেই তার রুপালী পর্দায় অভিষেক ঘটে। টম ক্রুজের জন্য সে সময় একটি ছোট চরিত্রেরও অনেক গুরুত্ব ছিলো। কারণ সে মুহূর্তে তার ওয়েটারের কাজটিও ছিল না। একই সময়ে টম ক্রুজ ‘ট্যাপস’ ফিল্মের জন্য অডিশন দেয় এবং ডিরেক্টরের পছন্দ হওয়ায় মিলিটারির  চরিত্র করার জন্য তাকে সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই টমকে সাইড ক্যারেক্টারের জন্য  সিলেক্ট করা হচ্ছিলো।

    ১৯৮৬ সালে ‘টপ গান’ নামক মুভিতে অভিনয়ের মাধ্যমে টম সুপারস্টার হয়ে ওঠেন। এ ছবিতে ইউ এস এ পাইলটের ভূমিকায় টম অভিনয় করেন। ছবিটি কমারশিয়ালি সুপার হিট হয় এবং টমের অনেক ফ্যান ফলোয়ার বেড়ে যায়। এরপর থেকে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অনেক পরিচালকই তাঁকে প্রস্তাব দেয়া শুরু করেন। ‘টপ গান’ মুভিটি তাঁকে অভিনয় জগতে অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণার মূল শক্তি দিয়েছে। মুভিটি সুপারহিট হবার জন্য ২০২২ সালে এর আরেকটি সিকুয়েল প্রকাশ পেয়েছে। ভক্তদের হয়তো অনেকেই জানেনা যে, টম নিজেও বাস্তব জীবনে একজন লাইসেন্সড পাইলট এবং তাঁর নিজস্ব ২টি প্রাইভেট জেট প্লেন রয়েছে।

    টম ক্রুজই প্রথম হলিউড অভিনেতা যার পরপর ৫টি সিনেমাতে ১০০ মিলিয়ন ডলার ইনকাম করার রেকর্ড আছে। বর্তমান সময়ে ১০০ মিলিয়ন ডলার ফিল্ম বিজনেসে বড় ব্যাপার না হলেও ৯০ দশকের সময় এটা আসলেই অনেক বড় ব্যাপার ছিলো।

    ১৯৯২ তে ‘আ ফিউ গুড ম্যান’ থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের ‘জেরি ম্যাগুয়ার’ পর্যন্ত টমক্রুজের সবগুলো সিনেমাতেই ১০০ মিলিয়ন বিজনেস হয়।

    ১৯৮৯ সালে টম ক্রুজ ‘বর্ন অন দ্য ফোর্থ অফ জুলাই’ মুভিতে এক ভিয়েতনাম যুদ্ধে আহত এক প্যারালাইজড চরিত্রের অভিনয় করেন। ঐতিহাসিক এই ভূমিকায় অভিনয় করতে টম এক বছর ধরে প্রস্তুতি নেন এবং তাঁর অসাধরন অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতার গোল্ডেন গ্লোব এওয়ার্ড অর্জন করেন এবং সেরা অভিনেতা হিসেবে টম ক্রুজের নাম প্রথম অস্কার পুরষ্কারের নমিনেশনে এসেছিলো।

    টম ক্রুজ এমন একজন অভিনেতা যে তাঁর নিজের স্টান্ট নিজেই নিয়ে থাকেন। সেটা বন্দুক যুদ্ধের দৃশ্য হোক অথবা কোন একশন দৃশ্যই হোক সে নিজেই সে দৃশ্যের অভিনয় করেন। এমনকি মিশন ইম্পসিবল সিনেমার একটি দৃশ্যে এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিং এ লাফিয়ে যাবার সময় সে তার গোড়ালিতে গুরুতর আহত হয়। শুটিং-টি তিনি না থামিয়ে দিয়ে আহত অবস্থাতেই শেষ করেন। এরপর হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য তিন মাস শুটিং থেকে বিরত রাখা হয়।

    টম ক্রুজ সিনেমা জগতে ১৯৮০ সাল থেকে কাজ করছে এবং এরই মধ্যে বেশ কিছু আইকনিক চরিত্র সে দিতে সক্ষম হয়েছে। টম ক্রুজের এতটাই চাহিদা ছিল যে সকল বড় বড় স্টুডিওতে তাকে প্রধান চরিত্রে নেয়ার জন্য সুযোগ খুঁজতো। নব্বই দশকে যখন মারভেল আইরন ম্যান বানানোর পরিকল্পনা চলছিলো তখনো টমকে সে চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জানানো হয়েছিলো। টম চরিত্রটির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলেও তাঁর নিজস্ব ক্রিয়েটিভ অভিনয়ের জন্য স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। কিন্তু সিনেমা পরিচালকের কাছে বিষয়টি ঠিক না লাগায় সিনেমার চরিত্রটি দীর্ঘকাল থামিয়ে রাখা হয়েছিলো। এবং পরবর্তিকালে রবার্ট ডাওনি কে দিয়ে সে চরিত্রে অভিনয় করানো হয়েছিলো।

    ‘শশাঙ্ক রিডেমশন’ সিনেমা জগতে শীর্ষে থাকা একটি সিনেমা। এই সিনেমার জন্যেও টম ক্রুজকে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিলো। সিনেমার কাহিনী টম ক্রুজ এর কাছে পছন্দের হলেও, সে সময় নতুন কোন ডিরেক্টরের সাথে কাজ করার ক্ষেত্রে টম আপত্তি জানায়।

    ১৯৯০-এর দশকে তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতাদের মধ্যে একজন যিনি গড়ে ১৫ মিলিয়ন ডলার আয় করেন। বিভিন্ন ব্লকবাস্টার হিট ছবি, যেমন ইন্টারভিউ উইথ দ্য ভ্যাম্পায়ার: দ্য ভ্যাম্পায়ার ক্রনিকলস (১৯৯৪), মিশন: ইম্পসিবল (১৯৯৬) এবং জেরি ম্যাগুয়ার (১৯৯৬), যার জন্য তিনি সেরা অভিনেতার একাডেমি পুরস্কারের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। টম ক্রুজের সবচেয়ে বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি মিশন ইম্পসিবলও বিশ্বব্যাপী মোট ৩ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। টম ক্রুজের সবচেয়ে বড় প্রযোজক ক্রেডিট হচ্ছে মিশন ইম্পসিবল ফ্র্যাঞ্চাইজি। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে টম ক্রুজ ব্যবসা সফল অনেক সিনেমা এবং নারী পুরুষের বিশাল ভক্ত থাকলেও সে কখনো অস্কার জিততে পারেনি। অস্কারে তিনটি সিনেমায় তাঁর নাম আসলেও পুরষ্কার না পাবার জন্য এখন আর সে অস্কার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন না। আশা করা হচ্ছে টপ গানঃ মেভেরিক (২০২২) সিনেমার জন্যও তিনি এইবার অস্কার নমিনেশন পাবেন। ইতিমধ্যেই টপ গানঃ মেভেরিক ১ বিলিয়ন ডলারের উপর বিজনেস করেছে। এবং ১ বিলিয়ন ডলার ক্লাবে টম ক্রুজের এই প্রথম সিনেমা।

    টম ক্রুজ তাঁর জীবনকালে তিনটি বিয়ে করেছিলেন। প্রথম বিয়ে মিমি রোজারস এর সাথে হয় ১৯৮৭ সালে এবং বিচ্ছেদ হয় ১৯৯০ সালে। পরবর্তী সময়কালে নিকোল কিডম্যানের সাথে বিয়ে হয় টম ক্রুজের এবং তাঁরা সংসার করেন ১৯৯০ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত। এ ঘরে তাদের ২ সন্তান রয়েছে। এরপর কেটি হোমস ২০০৬ সালে বিয়ে হয় এবং তাদের এক সন্তান রয়েছে এই পরিবারে। কেটি হোমসের সাথে ডিভোর্স হয় ২০১২ সালে।